রোজা রাখার মধ্যে রয়েছে যথেষ্ট শারীরিক উপকারিতা

প্রকাশিত: ১৪-০৪-২০২১, সময়: ১০:০৩ |
Share This

আওরঙ্গজেব কামাল : রোজা রাখার মধ্যে রয়েছে যথেষ্ট শারীরিক উপকারিতা। বিশেষ করে বছরে এক মাস অভুক্ত থাকলে তা স্বাস্থ্যরক্ষায় বেশ ভূমিকা রাখে।
রোজা রাখার ফলে এটা হ্রাস পেতে থাকে এবং রক্ত সঞ্চালনের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিকত্ব এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো বিভিন্ন রোগ থেকে আমাদের রক্ষা করে। রোজা রাখার ফলে ইউরিক অ্যাসিড এবং রক্তের ইউরিয়ার ঝুঁকিও হ্রাস পায়। যা শরীরে অধিক পরিমাণে বিদ্যমান থাকলে স্ট্রোক, হৃদরোগ, কিডনি রোগ এবং ডায়াবেটিসের মতো রোগের কারণ হয়ে থাকে। রোজা মস্তিষ্কের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অধিক খাদ্য গ্রহণে শরীরের ওপর যেমন চাপ বৃদ্ধি পায়, তেমনি এই চাপ মস্তিষ্কের ওপরও পড়ে। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, রোজার মাধ্যমে যে মানসিক পরিবর্তন আসে, তাতে মস্তিষ্ক থেকে এক ধরনের নিউরোট্রিফিক ফ্যাক্টর নিসৃত হয়, যা অধিক নিউরন তৈরিতে সাহায্য করে। এছাড়া ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য রোজা যথেষ্ট উপকারী। কারণ রোজা রাখা অবস্থায় দেহে নানা ধরনের ইনসুলিন তৈরি হয়, যা ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য বেশ উপকারী। কিডনির মাধ্যমে শরীরে প্রতি মিনিটে এক থেকে তিন লিটার রক্ত সঞ্চালিত হয়। কিডনির কাজ হলো শরীরের বর্জ্য পদার্থগুলো প্রস্রাব আকারে মূত্রথলিতে প্রেরণ করা। রোজা অবস্থায় কিডনি বিশ্রাম পায়। ফলে এ সময় কিডনি বেশ সক্রিয় হয়ে ওঠে।রোজার সময় সাহরিতে যে খাবার গ্রহণ করা হয়, তা থেকে ও লিভারে সঞ্চিত গ্লাইকোজেন থেকে সারা দিনের উপোসের সময় রক্তে প্রয়োজনীয় খাদ্য-উপাদান সঞ্চালিত হয়। লিভারের গ্লাইকোজেন স্টোরেজ শেষ হয়ে গেলে লিভার ও অ্যাডিপোজ টিস্যুতে জমা চর্বি বিপাকের মাধ্যমে রক্তে গ্লুকোজ সরবরাহ হয়। ফলে রমজানে একজন রোজাদারের জন্য লিভারের ফ্যাট ও শরীরের বাড়তি ওজন কমার সুযোগ তৈরি হয়। যাঁদের লিভারে ফ্যাট জমা হয়েছে, তাঁদের জন্য রোজা রাখা উত্তম।রোজার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষুধা নিবারণ হয় না; বরং ধীরে ধীরে ক্ষুধার প্রশিক্ষণ হয়। ফলে রমজান শেষে ক্ষুধার মাত্রাও কমে আসে। খাদ্যনালির পরিপাক প্রক্রিয়া আরো কার্যকর হয়ে ওঠে, খাদ্যদ্রব্য থেকে বেশি পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ সম্ভব হয়। তাছাড়া রোজা রাখার ফলে আগের চেয়ে আরো দক্ষভাবে কাজ করতে শুরু করে পাকস্থলী। সবল হয় হজমযন্ত্র। ইফতারে পুষ্টিকর উপাদানগুলোকে খুব সহজেই গ্রহণ করে শরীর। অ্যাডিপোনেকটিন নামের হরমোন বৃদ্ধি পায়, যা মাংসপেশিগুলোকে খাবার থেকে আরো বেশি পুষ্টিকর উপাদান শোষণে সক্ষম করে তোলে। আমার মতে রোজা শরীরের জন্য মহা ওষুধ। এছাড়া ইসলামের দৃষ্ঠিতে রোজার অনেক ফজিলত রয়েছে । আমারে প্রীয় নবী রমজানের আগমনে অনেক আনন্দিত হতেন। সাহাবাদের উদ্দেশ্যে এভাবে ঘোষণা দিতেন বিশ্বনবি সাল্লাল্রাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-
أتاكم رمضان شهر مبارك
‘তোমাদের দরজায় বরকতময় মাস রমজান এসেছে।’
তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআনের ঘোষণা দিয়ে এ মাসের বিশেষ ফজিলত বর্ণনা করতেন। আর তা ছিল এমন-
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা রাখা ফরজ (বাধ্যতামূলক) করা হয়েছে। যেভাবে তোমাদের আগের লোকদের (নবি-রাসুলের উম্মতের) ওপর ফরজ করা হয়েছিল। যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ১৮৩)
রমজান মাসের ফজিলত ও বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা
১. ফরজ রোজা পালন,২. কুরআন নাজিল,৩. জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়ার মাস
৪. জাহান্নামের দরজা বন্ধ,৫. শয়তানকে শৃঙ্খাবদ্ধ করা,৬. লাইলাতুল কদর পাওয়া
৭. দোয়া কবুল হওয়া,৮. জাহান্নাম থেকে মুক্তি,৯. ক্ষমা পাওয়া,১০. সৎ কাজের প্রতিদান বহুগুণে বেড়ে যাওয়া,১১. হজের সাওয়াব পাওয়া,১২. রোজাদারের বিশেষ সম্মান রয়েছে।
হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার জন্য একটি রোজা রাখবে, আল্লাহ তাআলা তার মুখমণ্ডল দোজখের আগুন থেকে ৭০০ বছরের রাস্তা দূরে রাখবেন।’ (বুখারি ও মুসলিম)।
হজরত আবু দারদা (রা.) ও হজরত আবু উমামা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলার জন্য পালনকৃত একটি রোজার ফলে জাহান্নাম (ওই রোজাদার ব্যক্তি থেকে) আসমান-জমিনের দূরত্বে অবস্থান করবে।’ (তিরমিজি ও তাবরানি)।
হজরত ওমর (রা.) ও হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দোজখ রোজাদার ব্যক্তি থেকে ১০০ বছরের দূরত্বে থাকবে।’ (তাবরানি)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য যে ব্যক্তি একটি রোজা পালন করবে, একটি কাকের সারা জীবন উড়ে যত দূর পথ অতিক্রম করা সম্ভব, জাহান্নাম তার কাছ থেকে তত দূরে থাকবে।’ (তরিকুল ইসলাম)।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি কেউ এক দিন নফল রোজা রাখে, তবে তার যে সওয়াব হবে, তা পৃথিবীর সমান স্বর্ণ দান করলেও তার সমান হবে না।’ (তাবরানি ও আবু ইয়ালি)।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রোজাদার ব্যক্তির দোয়া কবুল হয়। (বায়হাকি)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, হাদিসে কুদসিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে ‘আল্লাহ তাআলা বলেন, রোজা আমারই জন্য, আমি নিজেই তার প্রতিদান দেব; রোজা আমারই জন্য আমি নিজেই তার প্রতিদান।’ (বুখারি ও মুসলিম)।
আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে কুদ্সীতে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,‘আদম সন্তানের প্রতিটি আমলের ছাওয়াবই দ্বিগুণ করে দেয়া হয়। প্রতিটি সৎকাজ দশগুণ থেকে সাতশগুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: তবে রোজা ব্যতীত; কেননা রোজা কেবল আমার এবং আমিই এর প্রতিদান দিই। রোজাদার আমার জন্য তার লালসা ও খাদ্য পরিত্যাগ করে। রোজাদারের দুটি আনন্দ রয়েছে: একটি হলো রোজা ছাড়ার সময়, আর অন্যটি হলো তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময়। আর রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট কস্তুরির সুগন্ধি থেকেও প্রিয়। (বর্ণনায় বুখারী ও মুসলিম।)
ফলে যাঁদের শারীরিক সামর্থ্য ও ইচ্ছা রয়েছে, তাঁরা রমজান মাসের রোজাগুলো নিয়মমতো রাখা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

ফেসবুকে আমরা

সর্বশেষ সংবাদ

উপরে