ব্ল্যাক ফাঙ্গাস ছোঁয়াচে নয়

প্রকাশিত: ২৭-০৫-২০২১, সময়: ১৬:৫১ |
Share This

আওরঙ্গজেব কামাল : ব্ল্যাক ফাঙ্গাস ছোঁয়াচে নয়। এটি নিয়ে শঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকাটা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞেরা। তাঁরা বলছেন, এ ছত্রাকবাহিত রোগ বাংলাদেশে আগেও হয়েছে। এ ছত্রাক প্রকৃতির সর্বত্র আছে। রোগ প্রতিরোধ কমে গেছে, এমন ব্যক্তিদের এতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে আক্রান্ত হলে এতে মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে। ব্ল্যাক ফাঙ্গাস এমন একটা জীবাণু বা ফাঙ্গাস যা সর্বব্যাপী- মাটি, পানি ও বাতাসে ছড়িয়ে থাকলেও সংক্রমণ ক্ষমতা খুবই কম। এই ছত্রাক প্রাণীদের বিষ্ঠায়, বাসী খাবার, বাসী ফল, দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত খাদ্য সামগ্রী, অপরিষ্কার মাস্ক, অক্সিজেন ও আইসিইউ এর হিউমিডিফায়ারের মাধ্যমে সংক্রমিত হতে পারে। কোনো কারণে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলেই কেবল এই সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে- যেটা ১ লাখে ২০ থেকে ৩০ জন হতে পারে। যারা অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে ভুগছেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদির ধরে ভুগছেন, ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী, অতিরিক্ত ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, অন্তসত্ত্বা মহিলা, অত্যাধিক স্টেরয়েড গ্রহণ করা রোগী, কিডনি বা অন্য অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা রোগী এবং চরম অপুষ্টিজনিত রোগীদের ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের রাইনো অরবিটাল সেরিব্রাল ধরণটি নাক দিয়ে ঢুকে চোখ ও মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে পারে। এই রোগের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে লাইপোসোমাল এমফোটেরিসিন-বি ইনজেকশনের পর্যাপ্ত যোগান নিশ্চিত করতে হবে।
ল্যাক ফাঙ্গাস কী
মিউকরমাইকোসিস বা ব্ল্যাক ফাঙ্গাস সর্বত্র বিরাজমান। আমাদের চারপাশেই এটি আছে। বেশি সময় ধরে ঘরে রাখা আমাদের জুতাতেও এ ছত্রাক থাকতে পারে, দীর্ঘক্ষণ রাখা রুটিতেও এটি সৃষ্টি হতে পারে। মাটি, গাছপালা, সার বা পচনশীল ফল ও সবজির মধ্যে এটি থাকতে পারে। এটি কোনো বিরল কিছু না।
এখন কেন বেশি ছড়াচ্ছে
করোনা মহামারির এ সময়ে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস ছড়ানোর কথা বেশি শোনা যাচ্ছে। যেকোনো রোগে আক্রান্ত হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যায়। এ অবস্থায় রোগীর জটিল অবস্থা সৃষ্টি হলে স্টেরয়েড দেওয়া হয়। এটা প্রমাণিত যে এটি রোগীকে সহায়তাও করে। করোনায় আক্রান্ত রোগীকেও স্টেরয়েড দেওয়া হয় বা হচ্ছে। ফুসফুসে যখন ভাইরাসটি যায়, তখন আমাদের শরীরে অনেক বেশি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এমন মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়াকে আমরা ‘স্টর্ম’ও বলে থাকি। এতে রোগীর অবস্থা অনেক খারাপ হয়ে যায়। এই স্টর্ম বা ঝড়ের মধ্যে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বা অন্য যেকোনো ‘সুযোগসন্ধানী’ জীবাণু, যেগুলো কিনা সাধারণ পরিস্থিতিতে আক্রমণ করে না, তারা এ সময় সক্রিয় হয়ে ওঠে। স্টেরয়েড প্রয়োগ করে রোগীর এই বাড়াবাড়ি অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। কিন্তু যদি এই স্টেরয়েডের পরিমাণ বেশি দিয়ে দেওয়া হয় অথবা রোগীর কোমর্বিডিটি থাকে, তখন রোগীর প্রতিরোধের ক্ষমতা কমে যায়। এসব মানুষের মধ্যে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে অন্য যেকোনো জীবাণুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। স্টেরয়েডের সঠিক ব্যবহারে এর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
আবার যখন স্টেরয়েডটা দেওয়া হচ্ছে, তখন পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। পরিচ্ছন্নতার অভাব এই ফাঙ্গাস ছড়ানোর একটি কারণ হতে পারে।

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস কি ছোঁয়াচে

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস ছোঁয়াচে নয় মোটেও। তাই এ নিয়ে ভীতির কারণ নেই বলেই মনে করেন অণুজীববিজ্ঞানী অধ্যাপক সমীর সাহা। খুব কদাচিৎ এর সংক্রমণ দেখা যায়।
অণুজীববিজ্ঞানী বে-নজির আহমদের মন্তব্য, আক্রান্ত রোগী থেকে অন্যজনের হবে না। অর্থাৎ এটি মানুষে থেকে মানুষে ছড়ায় না বটে, তবে এটি ভিন্নভাবে ছড়াতে পারে। যেমন রোগীর চিকিৎসা-বর্জ্য হিসেবে এটি প্রকৃতিতে গেলে সেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা যদি নিরাপদ না থাকেন বা তাঁদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ব্ল্যাক ফাঙ্গাস কীভাবে মানুষের শরীরে যেতে পারে?যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যগত জটিল সমস্যায় থাকা ব্যক্তি বা চিকিৎসায় ওষুধ ব্যবহারের ফলে প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া ব্যক্তিদের এতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রকৃতিতে থাকা এ ছত্রাক নাক দিয়ে শ্বাসগ্রহণের মাধ্যমে সাইনাসে এবং ফুসফুসে ঢুকতে পারে। প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তির শরীরের কাটাছেঁড়া জায়গা, পোড়া জায়গা বা চর্মের কোনো ক্ষত থাকলে সেখানেও আক্রান্ত হতে পারে।
ব্ল্যাক ফাঙ্গাস কত মারাত্মক?
ভারতের উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, সেখানে মৃত্যুর হার ছিল শতকরা ৫০ শতাংশের বেশি।
কাদের ব্ল্যাক ফাঙ্গাস হওয়ার আশঙ্কা থাকে?যে মানুষগুলোর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অনেক কম, তারা এতে আক্রান্ত হতে পারে। ক্যানসার, এইডসে আক্রান্ত রোগীদের এতে সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। ডায়াবেটিস, ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার পর রেডিও থেরাপি বা কেমোথেরাপি নিচ্ছে, তারা খুব ঝুঁকিতে আছে। বংশ বা জন্মগতভাবে কেউ কেউ কম প্রতিরোধক্ষমতার অধিকারী। ঝুঁকি তাদেরও আছে। তাদের জন্য বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে, যাতে করে প্রকৃতি থেকে না আসে। যেসব রোগী স্টেরয়েড পেয়েছে, তাদের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কম থাকে। তাদেরও সাবধানে থাকতে হবে।
ব্ল্যাক ফাঙ্গাস ছড়ায় কীভাবে
যেহেতু এটি প্রকৃতিতে বসবাস করে, তাই যেকোনো সময় এটি ছড়াতে পারে। এটি যেকোনো সময়েই আমাদের সংস্পর্শে আসতে পারে। আমাদের স্বাভাবিক প্রতিরোধক্ষমতার বলেই এটি আক্রমণ করলেও কিছু হয় না। বে-নজির আহমেদ বলেন, ব্ল্যাক ফাঙ্গাস চোখ ও নাক দিয়ে প্রবেশ করতে পারে। চোখ থেকে আবার মস্তিষ্কে চলে যেতে পারে। এটা প্রাণঘাতী। আর সাইনাসের জায়গাটি ফাঁপা। সেখানে সংক্রমণ ব্যাপক আকারে হতে পারে এবং সেখান থেকে বেড়ে যেতে পারে।

ফেসবুকে আমরা

সর্বশেষ সংবাদ

উপরে