ফিরোজ আহম্মেদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি : ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের প্রাচীণ নলডাঙ্গা রাজবাড়ির প্রায় তিনশত বিঘা জমি দখল মুক্ত করতে সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছে নলডাঙ্গা রাজবাড়ির সম্পত্তি উদ্ধার ও উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদ নামের একটি সংগঠন। বুধবার বিকাল চারটার সময় রাজবাড়ির ইটভাটায় এই কর্মসূচী পালন করে। এসময় উপস্থিত ছিলেন, ১নং সুন্দরপুর দূর্গাপুর ইনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অহিদুল ইসলাম অদু, কালীগঞ্জ পৌর আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারন সম্পাদক মাসুদুর রহমান মন্টু, মুক্তিযোদ্ধা মন্টু গোপালসহ এলাকার কয়েকশত নারী পুরুষ। সমাবেশে সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক বলেন, যে রাজ্য রক্ষার জন্য সৈন্য বাহিনী ছিল, সে রাজ্য এখন আর নেই। রাজ প্রাসাদ রক্ষার জন্য চারিদিকে যে পরিখা খনন করা হয়েছিল, সেই প্রাসাদও আজ নেই। বাঁচবার জন্য বেগবতী নদীর সাথে যে সংযোগ সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছিল তাও মাটির সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে অনেক আগেই। যেখানে রাজপ্রাদ ছিল সেখানে এখন ইটের ভাটা চলছে। বাকি জমিতে ফসলের আবাদ হচ্ছে। ঐতিহ্যবাহি এই রাজ প্রাসাদের সম্পত্তি দখল এবং ধ্বংস করে চলেছে স্থানীয় কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি।
যদিও এ জমির দখলদাররা বলছে ঝিনাইদহের ঐতিহ্যবাহী নলডাঙ্গা রাজবাড়িটি নিলামে উঠলে তারা ন্যয্য দাম এবং সঠিক প্রক্রিয়ায় কিনেছেন।
জমির এক মালিক সাইদুর রহমান জানান, নিলামের মাধ্যমে আমার বাবা কিছু জমি কিনেছিলেন। বাবা বেঁচে নেই কিন্তু কাগজপত্র সবই আছে। কাগজে যদি কোন দুর্বলতা থাকে তাহলে হাসিমুখে সরকারকে সকল জমি ফেরত দিয়ে দেব।
সম্পত্তি উদ্ধার ও উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক অহিদুল ইসলাম অদু জানান, আমরা কারোর বিপক্ষে নয়। আমাদের দাবি কিছু প্রভাবশালী আইনের ফাক ফোকর দিয়ে সরকারী সম্পত্তি অবৈধভাবে ভোগদখল করে যাচ্ছে। আমরা চাই এসব সম্পত্তি উদ্ধার করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হোক।তিনি আরো জানান, রাজার প্রাসাদ না থাকলেও বেগবতি নদীর ধারে বহুকাল ধরে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে কালীমাতা মন্দির, লক্ষী মন্দির, গনেশ মন্দির, দূর্গা মন্দির, তারামনি মন্দির, বিঞ্চু মন্দির, রাজেশ্বরী মন্দিরসহ বিলুপ্ত প্রায় সুদৃশ্য আটটি মন্দির যা অবহেলিত। এখন দেশের প্রতœতত্ব্ বিভাগ অতি প্রাচীন এই ইতিহাস আর ঐতিহ্য রক্ষায় উদ্যেগি হলে এটি হতে পারতো এক অমুল্য সম্পদ।লোকমুখে এবং ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা যায়, প্রায় পাঁচশত বছর আগে এই রাজ বংশের আদি পুরুষ ভট্ররায়ন ফরিদপুরের তেলিহাটি পরগনার অধিন ভবরাসুর গ্রামে বসবাস করতেন। তারই এক উত্তর সুরী বিঞ্চুদাস হাজরা নলডাঙ্গার রাজ বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নবাবের চাকরী করে হাজরা উপাধি পান। তার পিতার নাম ছিল মাধব শুভরাজ খান। তিনিও নবাবের চাকরী করতেন। বৃদ্ধ বয়সে বিঞ্চুদাস ধর্মের প্রতি বিশেষ অনুরাগী হয়ে সন্ন্যাসী হন এবং ফরিদপুরের ভবরাসুর হতে নলডাঙ্গার নিকট খড়াসিং গ্রামে চলে আসেন। বেগবতী নদীর তীরে এক জঙ্গলে তপস্যা শুরু করেন। ১৫৯০ সালে মোঘল সুবেদার মানসিংহ বঙ্গ বিজয়ের পর নৌকা যোগে বেগবতী নদী দিয়ে রাজধানী রাজমহলে যাচ্ছিলেন। তার সৈন্যরা পথিমধ্যে রসদ সংগ্রহের জন্য অনুসন্ধানে বের হয়ে বিঞ্চদাস সনাœসীকে তপস্যারত অবস্থায় দেখতে পান। এসময় বিঞ্চুদাস সৈন্যদের খুব দ্রুত রসদ সংগ্রহ করে দেন। এতে সুবেদার মানসিংহ খুশি হয়ে সন্যাসীকে পার্শ¦তর্বী পাঁচটি গ্রাম দান করে যান। এই গ্রামগুলির সমন্বয়ে প্রথমে হাজরাহাটি জমিদারী এবং ক্রমান্বয়ে তা নলডাঙ্গা রাজ্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন এই এলাকাটি নল নটায় পরিপুর্ণ ছিল তাই স্থানটি নলডাঙ্গা নামেই অভিহিত হয়। এরপর প্রায় তিনশত বছর এ বংশের বিভিন্ন শাসক বিভিন্ন সময়ে এই রাজ বংশের শাসন করেন। বিভিন্ন শাসক বিভিন্ন সময়ে বিলুপ্তপ্রায় মন্দিরগুলো প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ১৮৭০ সালে রাজা ইন্দু ভূষণ যক্ষা রোগে মারা গেলে তার নাবালক দত্তক পুত্র রাজা বাহাদুর প্রথম ভূষণ দেবরায় রাজ্যের দ্বায়িত্ব ভার গ্রহন করেন। তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন আজকের এই বিলুপ্তপ্রায় কয়েকটি মন্দির যা কালের সাক্ষী হিসাবে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে বেগবতী নদীর তীরে। প্রকৃতপক্ষে রাজা বাহাদুর প্রথম ভূষণ দেবরায় ছিলেন বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার কুমড়াবাড়িয়া গ্রামের গুরুগোবিন্দ ঘোষালের কনিষ্ট পুত্র। তিনি রাজ বংশের কেউ ছিলেন না। রাজা ইন্দু ভূষণ মারা যাওয়ার দীর্ঘ নয় বছর পর ১৮৭৯ সালে পূর্ণ জমিদারী ভার গ্রহন করেন রাজা বাহাদুর প্রথম ভূষণ দেবরায় । ১৯১৩ সালে তিনি রাজা বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত হন। সে সময় তিনি শিক্ষার প্রতি অনুরাগি হয়ে পিতা-মাতার নামে ইন্দুভূষণ ও মধূমতি বৃত্তি চালু করেন যা তখনকার সময়ে এক বিরল ঘটনা। তিনিই ১৮৮২ সালে রাজবাড়ির নিকট আজকের নলডাঙ্গা ভূষণ হাই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। যেটি এখন কালীগঞ্জে প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত। রাজা বাহাদুর প্রথম ভূষণ দেবরায় ১৯৪১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী ভারতের কাশিতে মারা যান। কুমার পন্নগ ভূষণ দেবরায় ও কুমার মৃগাংক ভূষণ দেবরায় নামে তার দুই পুত্র ছিল। ১৯৫৫ সালে এক সরকারী আদেশে অন্যান্য জমিদারীর মতো এই জমিদারীও সরকারের নিয়ন্ত্রনে চলে যায় এবং রাজ বংশ শেষ বারের মতো লোপ পায়।
কিন্তু কালের স্বাক্ষী হিসাবে দাড়িয়ে আছে তারই প্রতিষ্ঠিত বিলুপ্ত প্রায় মন্দির গুলো। যা দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন। নাহলে বর্তমান প্রজন্ম হারাবে অমূল্য কিছু প্রতœতত্ব সম্পদ।