ফিরোজ আহম্মেদঃ বাড়িতে বসে মা সাপিয়া খাতুন সিঙ্গাড়া-চপ তৈরী করেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বাবা সামছের আলী অন্যের সহযোগিতায় সেগুলো পৌছে দেন। আর আরেক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছেলে উজ্জল হোসেন মোল্লা ভাঙ্গাচুরা দোকানটিতে বসে সেগুলো বিক্রি করেন।
এভাবে চলছে শৈলকুপার সাতগাছি মোড়ের বাবা-ছেলের সিঙ্গাড়ার দোকান।
যে দোকানের ব্যবসা করেই চলে তাদের ৫ জনের সংসার। স্থানীয়রা বলছেন, এই দোকানের খাবারগুলো খুবই সুস্বাধু হয়। যে কারনে দ্রুতই বিক্রি হয়ে যায়।
দুপুরের পর শুরু হয়ে সন্ধ্যার পূর্বেই বিক্রি শেষ হয়ে যায়। বাবা-ছেলের দাবি অন্যের একটি পরিত্যাক্ত ভাঙ্গাচুরা দোকানে তারা ব্যবসা করছেন। অর্থের অভাবে ভালো দোকান তৈরী করতে পারছেন না। ফলে দোকানে বিক্রি ভালো থাকলেও সবসময় পর্যাপ্ত খাবার রাখতে পারেন না। সাতগাছি ঝিনাইদহ শৈলকুপা পৌরসভার একটি গ্রাম। এই গ্রামের মোহাম্মদ মোল্লার ছেলে সামছের আলী মোল্লা (৬২)। তার দুই সন্তান উজ্জল হোসেন মোল্লা (৩২) ও সুজন হোসেন মোল্লা (২৮)। উজ্জল তার মতোই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আর সুজন সুস্থ্য। তবে তার পৃথক সংসার। সামছের আলী জানান, ছোট বেলায় ভালোই ছিলেন। মাঠে কৃষি কাজ করতেন। ১৯৮৫ সালের কথা, তার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে শুরু করে। স্থানীয় ভাবে চিকিৎসক দেখান। ওই বছরেই খাবার খেতে বসে হঠাৎ চোখে আর দেখতে পাননি। সেই থেকে অন্ধ হয়ে গেছেন। পরবর্তীতে অনেক চিকিৎসক দেখিয়েছেন, কিন্তু লাভ হয়নি।
ছেলে উজ্জল হোসেন মোল্লা (৩২) জানান, বাবা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়ায় তাকে হাত ধরে নিয়ে বেড়াতে হতো। এই কারনে তার পড়ালেখা হয়নি। কিশোর বয়সেই কৃষি কাজে নেমে পড়েন। মাত্র ১৭ বছর বয়সে কলের লাঙ্গল চালাতেন। একদিন বুঝতে পারেন তিনি চোখে সবকিছু ঝাপসা দেখচ্ছেন। দ্রুত চিকিৎসকের কাছে ছূটে যান। তারা জানিয়ে দেন উচ্চরক্তচাপের ফলে দুটি চোখই নষ্ট হয়ে গেছে। আর কখনও দেখতে পারবেন না। এই অবস্থায় অসহায় হয়ে পড়েন। উজ্জল জানান, ছোট ভাই বিয়ের পর পৃথক হয়ে যান। সে সময় তারা অন্ধ বাবা-ছেলে কি করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। ভীটাবাড়ি আর মাঠে মাত্র ১২ শতক জমি আছে। এই জমির আয়ে সংসার চলে না। বাড়িতে মা, তার স্ত্রী ও এক কন্যা রয়েছে। এই অবস্থায় সাতগাছি গ্রামের মোড়ে একটি টিনের চালা তৈরী করে সেখানে সিঙ্গাড়া, চপ আর পিয়াজী বিক্রি শুরু করেন। প্রথমে তার বাবা এই দোকান চালাতেন। এখন বাবার শারীরে আরো সমস্যা দেখা দেওয়ায় তিনিই বসেন। বাবা পাশে থেকে সহযোগিতা করেন। উজ্জল জানান, বাড়িতে তার মা এগুলো তৈরী করেন। বাবা অন্যের সহযোগিতায় সেগুলো দোকানে আনেন। তিনি বসে বিক্রি করেন।
উজ্জল আরো জানান, প্রতিদিন ১৭০ থেকে ১৮০ পিচ সিঙ্গারা, ১৫০ থেকে ১৬০ পিচ চপ আর ৩ থেকে ৪ কেজি পিয়াজী বিক্রি হয়। এলাকার মানুষ তাদের খুব সহযোগিতা করেন। তাছাড়া টাকা হাতে নিলে বুঝতে পারেন কত টাকার নোট। আর দাড়িপাল্লায় ওজনই নিজেই দেন। এভাবে প্রতিদিন ৩ শতাধিক টাকা আয় হয়। যা দিয়ে তাদের সংসার চলে। সবাই ঠিকঠাক পয়সা দিয়ে দেন বলে জানান।
ইতিপূর্বে তারা অন্য একটি চালায় বসে ব্যবসা করতেন। সেটা ভেঙ্গে যাওয়ায় গ্রামের বাকা মোল্লার একটি পরিত্যক্ত ঝুপড়ি দোকানে বসছেন। উজ্জল জানান, অর্থের অভাবে একটা ভালো দোকান তৈরী করতে পারছেন না। যে কারনে চাহিদা থাকা সত্বেও পর্যাপ্ত খাবার রাখতে পারেন না। তিনটি টিনের পাত্রে (গামলায়) এই সিঙ্গাড়া, চপ আর পিয়াজী রেখে বিক্রি করেন।
এ বিষয়ে ওই গ্রামের বাসিন্দা রামিম হাসান জানান, তারা বাবা-ছেলে খুবই ভালো দুইটি মানুষ। তারা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হলেও পরিশ্রমি। প্রতিবন্ধী হয়েও দোকানের পাশাপাশি মাঠে মানুষের ক্ষেতে সেচ দেওয়ার কাজ করেন। এই কাজেও তার মা সহযোগিতা করে থাকেন। তার একটা নিজস্ব দোকান হলে আরো ভালো ব্যবসা করতে পারতো বলে তিনি উল্লেখ করেন।