আওরঙ্গজেব কামাল : গাছে গাছে রঙিন ফুল জানান দিচ্ছে, বসন্ত এসে গেছে। শুরু হলো বসন্ত। অপরদিকে আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। প্রেমে-ভালোবাসায় মাতোয়ারা হওয়ার দিন আজ। প্রকৃতির পালাবদলে কাল এসেছে বসন্ত, সেই ফাগুনের মাতাল হাওয়ায় আজ উদ্দাম ভেসে যাবে সকলের হৃদয়। ভালোবাসার রঙে রঙিন হবে সকল শ্রেনী পেশার মানুষ। মনের যতো বাসনা, যতো অব্যক্ত কথা ডালাপালা মেলে ছড়িয়ে পড়বে বসন্তের মধুর হাওয়ায়। কপোত-কপোতী পরস্পরকে নিবেদন করবে মনের যতো কথা, জানাবে ভালোবাসা। আজ চুপকথা শুনবার ও শোনানোর দিন। আজ কারো কারো চুপকথাগুলো হয়ে যাবে রূপকথা। সারাজীবন মনে রাখার মতো । এখনো শীতের রেশ। থেকে থেকে বইছে দমকা বাতাস। তবে কুহেলিকাভেদী নরম রোদ, গাছে গাছে নতুন পাতা, তাতে রোদের ঝিকিমিকি, কোকিলের কুহু ডাক—এ সবই নিভৃতে বলে যাচ্ছে, ‘বসন্ত এসে গেছে। আজ পহেলা ফাল্গুন। ভালোবাসা দিবসও। ঋতুচক্রের নিয়মে এসেছে ঋতুরাজ বসন্ত। নিষ্পত্র শাখাগুলোতে নবীন কিশলয়। অজস্র পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম আভায় বনে লাগছে আগুন। তার আঁচ লাগছে নবীন-প্রবীণ মনেও। ভোরের বাতাসে জেগে উঠছে নতুন প্রাণ।এ ঋতু ফুলের ঋতু। পশ্চিমের বসন্তে চেরি ফুলে ভরে ওঠে প্রকৃতি। আমাদের বসন্তের ফুলের যেন অভাব নেই। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, কাঁঠালচাঁপা, কাঠগোলাপ, নাগেশ্বর, রুদ্রপলাশ, মহুয়া, রক্তকাঞ্চন, দেবদারু, স্বর্ণশিমুল—কত কত ফুল। এ বসন্তে থোকায় থোকায় ফোটে নজরুলের প্রিয় ফুল দোলনচাঁপা। ফোটে রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ফুল অশোক, পলাশ, শিমুল। এমনই সময়ে আমের মুকুলের ঘ্রাণে পাগল হয়েছিল কবিগুরুর মন।
মধুমাস চৈত্রের ঋতু এ বসন্ত। মধ্যযুগের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী বলেছেন, ‘মধুমাসে মলয় মারুত মন্দ মন্দ। মালতীর মধুকর পিয়ে মকরন্দ। ’ অর্থাৎ মধুমাসে মৃদুমন্দ বাতাস বয়, মৌমাছিরা ফুলের মধু খায়। প্রকৃতির মতো মানুষের মনেও এ সময় নতুন আনন্দ ভাব জাগে। এ ভাব প্রণয়ের। বৈষ্ণব পদাবলিতে বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাসের মতো কবিরা প্রেমরসের কবিতা লিখেছেন। এরই অপর নাম মধুর রস। মধ্যযুগের আরেক কবি দৌলত উজির বাহরাম খান বলেছেন, ‘মধুমাসে উতলা বাতাস, কুহরে পিক; যদি সে কমল শিশিরে দহল কি করিব মধুমাসে। তাই বসন্ত ভালোবাসার ঋতু। অনুভব আর আবেগের ঋতু। পশ্চিমের ভ্যালেনটাইনস ডে বা ভালোবাসা দিবসের ধারণা এসে মিলেছে আমাদের বসন্তে। বাংলা একাডেমি পঞ্জিকা সংশোধনের পর এখন পহেলা ফাল্গুন আর ভালোবাসা দিবস একই দিনে উদযাপিত হয়। ভালোবাসার মানুষকে আরো কাছে পাওয়ার সময় এ বসন্ত। বসন্ত আসে তরুণের পোশাকে, মননে, সংগীতে। বাঁধনহারা মন এ সময় গেয়ে ওঠে, ‘মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে। তবে বসন্ত কেবল প্রেমের ঋতু নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির দ্রোহের ইতিহাসও। এমনই এক বসন্তে বাঙালি ভাষার জন্য আন্দোলন করেছিল। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটি ছিল ৮ ফাল্গুন। সেদিন মাতৃভাষার মর্যাদা রাখতে জীবন দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর।বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের হাত ধরে বাঙালি করেছে বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলন আর ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। সেদিক থেকে দেখতে গেলে বসন্তে রোপিত হয়েছিল বাংলাদেশের জন্মের বীজ। রোমানরা খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার আগে প্যাগান (পৌত্তলিক) ধর্মের অনুসারী ছিলেন।প্যাগান ধর্মের লোকজন খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে পূর্বপুরুষদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ফেব্রুয়ালিয়া পূজা পালন করতেন। এই ফেব্রুয়ালিয়া অনুষ্ঠানের নামানুসারে পরবর্তীতে ইংরেজি মাসের নামকরণ করা হয় ফেব্রুয়ারি।তখন ফেব্রুয়ারি মাসের ১৩ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত এই পূজা হতো।পূজার উদ্দেশ্য ছিল দেবতার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে পুণ্যতা, উর্বরতা ও সমৃদ্ধি লাভ করা। অনুষ্ঠানের মাঝের দিনটি ছিল খুবই আকর্ষণীয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি দেবীরাণী জুনোর সম্মানে পবিত্রতার জন্য কুকুর আর উর্বরতার জন্য ছাগল উৎসর্গ করা হতো।উৎসর্গীকৃত কুকুর ও ছাগলের রক্তে রঞ্জিত হয়ে যুবকেরা চামড়ার তৈরি সামান্য পোশাক পরতো।তারপর চামড়ার বেত দিয়ে দেবীর নামে তরুণীদের শরীরে আঘাত করতো। সে সময়ের মানুষ বিশ্বাস করতো, এই আঘাতের কারণে দেবী ওই তরুণীদের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেবেন।দিনটির আরও একটি বিশেষত্ব হলো, এ দিনেই পরবর্তী এক বছর আনন্দ দেওয়ার জন্য দেবীর ইচ্ছায় লটারির মাধ্যমে তরুণরা তাদের তরুণী সঙ্গীকে বেছে নিতেন। প্রথানুযায়ী বড় একটি বাক্সে তরুণীদের নাম লিখে রাখা হতো। সেখান থেকে তরুণরা একেকটি নাম তুলে পরবর্তী বছর লটারি হওয়া পর্যন্ত নির্বাচিত যুগল একসঙ্গে থাকার সুযোগ পেতেন।এরই মাঝে ২৬৯ সালে ঘটে যায় একটি বিরল ঘটনা।সে সময় রোমান সম্রাট ছিলেন ক্লাডিউয়াস।খ্রিস্টান ধর্মযাজক, সমাজসেবক ও চিকিৎসক স্টিভ ভ্যালেন্টাইন নামের এক যুবক ধর্ম প্রচারকালে রোমান সম্রাট ক্লাডিউয়াস এর নানা আদেশ লঙ্ঘনের দায়ে গ্রেপ্তার হন। এই আদেশের অন্যতম একটি ছিল, রোমান সম্রাট ক্লাডিউয়াস কর্তৃক যুবক সেনাদের বিয়ে করা নিষেধ করে দেওয়া।স্টিভ ভ্যালেন্টাইন সম্রাটের এই আদেশের বিপরীতে গিয়ে যুবক সেনাদের বিয়ের জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন ও গোপনে বিয়ে দিয়ে দিতেন। এছাড়া জনগণকে ধর্মদ্রোহী করা, সম্রাটের বিপক্ষের যুদ্ধাহত খ্রিস্টান সৈন্যদের চিকিৎসা করা এবং রাষ্ট্রদ্রোহী কর্মকাণ্ডের জন্য সম্রাটের রোষানলে পড়ে গ্রেপ্তার হন বিদ্রোহী যুবক স্টিভ ভ্যালেন্টাইন।ভ্যালেন্টাইনকে কারাগারে পাঠানোর পর জনগণের কাছে তিনি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।এই সাহসী এবং জনপ্রিয় যুবককে দেখার জন্য প্রতিদিন অগণিত মানুষ কারাগারে যেতেন। এর মধ্যে এক কারারক্ষীর অন্ধ মেয়ে ‘জুলিয়া’ ও ছিলেন। ভ্যালেন্টাইনের সঙ্গে তিনি প্রায়ই কারাগারে দেখা করতেন এবং দীর্ঘসময় তারা এক সঙ্গে কাটাতেন।এর মধ্যে ঘটে যায় আশ্চর্যজনক এক ঘটনা।স্টিভ ভ্যালেন্টাইন তার আধ্যাত্মিক চিকিৎসার মাধ্যমে অন্ধ জুলিয়াকে সুস্থ করে তোলেন এবং তাকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করেন। এক সময় ভ্যালেন্টাইন ও জুলিয়া একে অন্যের প্রতি গভীর ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়েন। এই সংবাদ শোনার পর সম্রাট ক্লাডিউয়াস আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং ২৭০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, দিনের কোনো এক সময়ে, হাজারো মানুষের সামনে স্টিভ ভ্যালেন্টাইনকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। নির্বিকার, সাহসী যুবক স্টিভ ভ্যালেন্টাইন ফাঁসিকাষ্ঠে যাওয়ার আগে, তার ভালোবাসার মানুষ জুলিয়াকে একটি চিঠি লিখে যান। যে চিঠির শেষে লেখা ছিল ‘তোমার ভ্যালেন্টাইনের পক্ষ থেকে’।এরপর কেটে যায় ২২৬ বছর। এক সময় লিওপারসালিয়া বা ফেব্রুয়ালিয়া পুজার নাম ও পদ্ধতি পরিবর্তন করে নিজ ধর্মের যাজক স্টিভ ভ্যালেন্টাইনের নামে অনুষ্ঠানের নামকরণ করেন তারা। সেই সময় মানে ৪৯৬ সাল থেকেই ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ বা ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’ এর সূচনা। কিন্তু মধ্যযুগে এসে সমস্ত ইউরোপে ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপন দীর্ঘকাল নিষিদ্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে ইংরেজি সাহিত্যের জনক জিওফ্রে চসার’ ১৩৮২ সালে তার ‘পার্লামেন্ট অব ফাউলস’ এর মধ্যে ভ্যালেন্টাইন ডে নিয়ে লেখেন। এরপর উইলিয়াম শেকসপিয়রসহ অনেক খ্যাতিমান সাহিত্যিকরা তাদের সাহিত্যে এ বিষয়টিকে তুলে আনেন।অবশেষে ১৬৬০ সালে রাজা চার্লস-টু পুনরায় দিবসটি পালনের প্রথা চালু করেন।স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১৪ সালে সৌদি আরবের পুলিশ ভ্যালেন্টাইন ডে পালনের দায়ে সে দেশে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে। আর ইরান, পাকিস্তান, মালয়েশিয়ায় ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কেবল মুসলিম দেশ নয়, ভারত সরকারও তাদের নিজস্ব সভ্যতা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক মনে করায় দিবসটি পালনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে দেয়।এই হচ্ছে মোটামুটি ভ্যালেন্টাইন ডে বা ভালোবাসা দিবসের পেছনের ইতিহাস। আজকের এই বিশেষ দিনের প্রত্যাশা, কেবল নর-নারীর মধ্যে নয়, বিশ্বজুড়ে মানুষে মানুষে ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়ুক। যুদ্ধ কিংবা হানাহানি নয়, ভালোবাসা দিয়েই মানুষ জয় করুক সবার হৃদয়।