আওরঙ্গজেব কামাল : রহমত, মাগফিরাত আর নাজাতের বার্তা নিয়ে মুমিনের দরজায় কড়া নাড়ছে সিয়াম সাধনার মাস রমজান। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান। তাই সংযমের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি করে মহান আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ কামনার জন্য কিন্ত রমজান আসলে কেন দফায় দফায় নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়? যে খানে বিশ্বের অনেক দেশে রমজান কে কেন্দ্র করে নিত্যপণ্যের দাম কমায়,সেখানে আমাদের দেশে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। বর্তমানে নিত্যপণ্যের মুল্য নিয়ে মানুষ বিপাকের মধ্যে রয়েছে। কয়েক দিন ধরে সয়াবিনের দাম বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভে যখন ফুঁসছে ভোক্তারা তখনি আবার দাম বাড়ার ফাঁদে পড়েছে ২৪ নিত্যপণ্য। রোজা আগমনের সঙ্গে নিত্যপণ্যের মূল্য আরেক দফা বাড়ায় ক্রোদের পারদ যেন উর্ধ্বমুখী। দাম বাড়ার এ তথ্য প্রকাশ করেছে খোদ সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। রমজান মাস শুরুর আগে আরেক দফা বাড়লো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। অর্থাৎ টানা তিন মাস ধরে কমবেশি দাম বড়েই চলেছে। বাজারের তথ্য বলছে, গত সপ্তাহের তুলনায় এই সপ্তাহে নতুন করে বেড়েছে মুরগির দাম। নতুন করে দাম বাড়ার তালিকায় রয়েছে খোলা সয়াবিন, খোলা পাম অয়েল, মসুর ডাল। দাম বেড়েছে মাছ-মাংসের পাশাপাশি ইফতার ও সেহরিতে ব্যবহৃত নিত্যপণ্যের। বাজার ঘুরে দেখা গেছে দাম বাড়ার ২৪টি নিত্যপণ্যের মধ্যে সংসারের প্রয়োজনীয় ১০টি নিত্যপণ্য রয়েছে। এতে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ তাদের আয় দিয়ে চাহিদা অনুযায়ী পণ্য কিনতে পারছে না। শুক্রবার রাজধানী ও তার পার্শ্ববর্তী বাজার ঘুরে দেখা যায়, গরুর মাংস প্রতি কেজি ৭০০ টাকার নিচে কিনতে পারছে না ক্রেতারা। হাড় ছাড়া গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকা কেজি। কোথাও কোথাও হাড়সহ ৭৫০ টাকায় ছাড়িয়েছে। এদিকে গত সপ্তাহের ১৭০ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া ব্রয়লার মুরগি শুক্রবার বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকা। এছাড়া লেয়ার ২৬৫ ও কক মুরগি ৩৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বড় দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে পিস প্রতি ৫০০, মাঝারি ৪৫০ ও ছোট মুরগি ৪০০ টাকায়। সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির তথ্য বলছে, গত সপ্তাহের তুলনায় এই সপ্তাহে দেশি মুরগির দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ শতাংশ। আর ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে কেজিতে ৭ শতাংশের মতো। এদিকে ফার্মের মুরগির ডিমও গত সপ্তাহের মতো ১১০ থেকে ১১৫ টাকা ডজন বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া রোজা আসতে না আসতেই বেগুনের কেজি ১০০ টাকা বিক্রয় শুরু হয়েছে। রোজা শুরু হওয়ার আগ মুহূর্তে রাজধানীর বাজারগুলোতে বেড়ে গেছে বেগুনের দাম। এক লাফে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে কোনও কোনও বাজারে বেগুনের কেজি বিক্রি হচ্ছে গোল টা একশ’ টাকা। খুচরা ব্যবসায়ীরা বেগুনের কেজি বিক্রি করছেন ৭০ থেকে ৮০ টাকা। গত সপ্তাহে এই বেগুনের কেজি ছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকা। এ বিষয়ে হাসিব নামের এক খুচরা তরকারী ব্যবসায়ী বলেন সাধারণত রোজার সময় বাজারে বেগুনের চাহিদা বেড়ে যায়, এবারও তেমনটি হয়েছে। বেগুনের চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু সেই তুলনায় সরবরাহ কম। এ কারণে দাম বেড়েছে। বাজার ঘুরে দেখাযায় মসুর ডাল দেশী দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ টাকা। গত সপ্তাহে এই ডাল বিক্রি হয়েছে ১১৫ টাকা কেজি দরে। শুক্রবার সেই একই মসুর ডাল ১২০ টাকার নিচে বিক্রি করছেন না ব্যবসায়ীরা। গত তিন সপ্তাহ ধরে টানা এই পণ্যটির দাম বাড়ছে। আবাও নতুন করে বেড়েছে খোলা সয়াবিনের দাম। বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম সামান্য কিছু কমলেও ভোক্তার জন্য তেমন কোনও সুখবর নেই সয়াবিন তেলের বাজারে। যদিও সয়াবিন তেলের উৎপাদন, খুচরা ও সর্বশেষ আমদানি পর্যায়ে সরকার মোট ৩০ শতাংশ কর ছাড় দিয়েছে ব্যবসায়ীদের। কিন্তু বাজারে তেমন এর প্রভাব এখনও দেখা যায়নি। সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির তথ্য বলছে, প্রতিলিটার খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ১৫৪ টাকা। গত সপ্তাহে এই সয়াবিন তেল বিক্রি হয়েছে ১৫৩ টাকা লিটার। আর পাম অয়েল (খোলা) ১৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে খোলা পাম অয়েল বিক্রি হয়েছে ১৩৫ থেকে ১৩৬ টাকা। খুচরা ব্যবসায়ীরা ৫ লিটার বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি করেছেন ৭৪০ থেকে ৭৬০ টাকা। তবে সাধা চিনির মুল্য আগের মতোই ৮০ টাকা কেজি তে বিক্রয় হচ্ছে। কিন্তু দেশী লাল চিনি প্রতি কেজীতে ১০ -২০ টাকা বেড়ে বিক্রয় হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। এদিকে চিনি আমদানিতে শুল্ক ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ নির্ধারণ করেছে সরকার। কিন্তু গত চার সপ্তাহ ধরে এর প্রভাব দেখা যায়নি বাজারে। আগের মতোই ৮০ টাকায় চিনির কেজি বিক্রি হচ্ছে। ফুলকপি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, শিমের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৬০ টাকা, শালগম (ওলকপি) ৩০ থেকে ৪০ টাকা, মুলা ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া লাউয়ের পিস বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। লাল শাকের আঁটি ১০ থেকে ১৫ টাকা, পালং শাকের আঁটি বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ টাকা। এদিকে সজনের ডাঁটা বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে। পাকা টমেটো ২০ থেকে ৩০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। পটল ৫০ থেকে ৬০ টাকা, বরবটি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, ঢেঁড়শ ৪০ থেকে ৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। রোজায় লেবুর চাহিদা থাকায় হালিপ্রতি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৪০-৮০ টাকায়। তবে
পেঁয়াজের দাম স্বভাবিকের চেয়ে কম রযেছে। বর্তমানে আলু ২০ টাকা, দেশি আদা ৯০-১০০, চায়না আদা ৮৫, চায়না রসুন ১০০, দেশি রসুন ৬০-৭০ ও শুকনা মরিচ ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। মুগডাল ১২৫, বুটের ডাল ৮০, অ্যাংকর ডাল ৫৫,
ছোলা ৮০-৯০ টাকা। এছাড়া মিনিকেট চাল ৫৫, নাজিরশাইল চাল ৭০ ও চিনি ৭৮ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। তবে ইফতারীর জন্য তৈরী বেশন প্রতি কেজী ১০০টাকা, যাহা গত সপ্তাহে ছিলো ৭০-৭৫ টাকা, অ্যাংকর ডাল ভাঙ্গানো প্রতি কেজী ১০০ টাকা যাহা গত সপ্তাহে ছিলো ৭০-৭৫ টাকা। বর্তমানে মাছের দাম অনেক চড়া। সাধারন মানুষ অভিযোগ করে বলেছেন মাছ তাদের ক্রয় ক্ষমতার বাহিরে। মামুন নামের এক ওষুধ বিক্রয় প্রতিনিধি বলেন আমি স্বল্প বেতনে চাকুরী করি কিন্তু বাজারের দ্রব্যমুল যে হারে দ্রব্যমুল্য বেড়েছে তাতে ডাল ভাত খাওয়া সম্ভাব নয়। বাজার ঘুরে দেখায়ায় বড় মাছের তুলনায় ছোট মাছের দোকানেই ভিড় বেশি। ছোট পাবদা মাছ বিক্রি হচ্ছে ৪৫০, বড় পাবদা ৬০০, গলশা ৭০০, পোয়া মাছ ৬০০, বাইম ৯০০, বাতাসি ৮০০, মলা ৫০০, কাঁচকি ৫০০-৬০০, শিং ৪৫০-৫০০ এবং গুড়া মাছ বিক্রি হচ্ছে ৪০০ টাকা কেজি দরে। রুই মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৮০ থেকে ৪৫০ টাকা। শিং ও টাকি মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা। শোল মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৬৫০ টাকা। তেলাপিয়া ও পাঙাশ মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৭০ টাকা। এক কেজি ওজনের ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা। ছোট ইলিশ মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। বাজারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চিকন চাল ৫০ কেজির বস্তায় বেড়েছে ৩০০ – ৪০০ টাকা। এভাবে সব কোম্পানির চালের দাম বস্তায় ২০০-৩০০ টাকা করে বেড়েছে।চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভালো মানের মিনিকেট ও নাজিরশাইল চাল তারা বিক্রি করছেন ৬৩ থেকে ৭৫ টাকা কেজি। যা গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে দুই ২ টাকা বেশি। এদিকে খাসির মাংসও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, কেজি প্রতি ৯০০-১০০০ টাকা। সারা দিন রোজা রাখার পর যারা ইফতারে লেবুর শরবত পান করতে পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য দুঃসংবাদ আছে। রোজা শুরুর আগেই লেবুর দাম বেড়ে গেছে। এক সপ্তাহ আগেও যে লেবু প্রতি হালি বিক্রি করা হতো ৩০ থেকে ৪০ টাকায়, আজ শুক্রবার (০১ এপ্রিল) রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজারে তা বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়।রাজধানীর মিরপুরের ১ নম্বর বড় বাজার, মিরপুর রায়েনখোলা বাজার ও পল্লবী এলাকার বিভিন্ন বাজারের সবজি বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে বেগুন, শসা ও পেঁয়াজের কোনো ঘাটতি নেই। রোজাকে কেন্দ্র করে ক্রেতারা এসব পণ্য বেশি পরিমাণে কিনছেন। এর প্রভাবে দাম বেড়েছে। আর লেবু ও ধনেপাতার সরবরাহ আগের চেয়ে একটু কমেছে। দাম বাড়ার কারণ, রোজার আগে এই দুই পণ্যের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। গত কয়েক বছর ধরে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে দেশে অনেক অসন্তোষ দেখা গেছে। বিগত কয়েক মাসে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে খরচ সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষেরা। যদিও সরকারি হিসাবে দেখা যাচ্ছে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি গত পাঁচ বছর ধরে গড়ে সাড়ে ৫ শতাংশের কাছাকাছি আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী খাদ্য মূল্যস্ফীতির যে বার্ষিক হার তার সঙ্গে বাজারে খাদ্যপণ্যের দামের ওঠানামা মেলে না। ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল গড়ে সাড়ে পাঁচ শতাংশের কিছুটা বেশি (৫.৬৬%)। অর্থাৎ, ধারাবাহিকভাবে মূল্যস্ফীতি পাঁচ শতাংশের ওপরে থাকা মানে হচ্ছে, ২০১৬ সালে যে খাদ্যপণ্য কিনতে ১০০ টাকা খরচ করতে হতো, ২০১৭ সালে সেই একই পণ্য কিনতে ১০৫ টাকার বেশি খরচ করতে হয়েছে।উল্লেখ্য, চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী রোববার বা সোমবার পবিত্র রমজান মাস শুরু হতে পারে। রোজার আগেই কিছু পণ্যের দাম আরেক দফা বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) এ এইচ এম সফিকুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, সরবরাহ কম-বেশি হওয়ার কারণে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৫ টাকা বাড়তে পারে। বাজার নিয়ন্ত্রণে দিনরাত কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, রোজার সময় মূলত সরবরাহের বিপরীতে চাহিদা বেড়ে যাওয়াতেই মূল্যবৃদ্ধি পায়। এ ক্ষেত্রে ভোক্তার অধিকার রক্ষায় যেসব আইন আছে, সেগুলো প্রয়োগ করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। পণ্যের সুষ্ঠু বিতরণব্যবস্থাও গড়ে তোলা প্রয়োজন। এটি করা গেলে বাজারের ওপর চাপ কমবে এবং দামও কমে আসবে।