প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর এবং নিরাপত্তা চুক্তি

প্রকাশিত: ২৭-০২-২০১৭, সময়: ২০:৫০ |
খবর > মতামত
Share This

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী :

বৃহস্পতিবার ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের পররাষ্ট্র সচিব জয়শংকর ঢাকা সফরে এসেছিলেন। তিন বার পেছানোর পর এবার স্থির হয়েছে আগামী এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে যাবেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব সহিদুল হক বলেছেন, তিস্তা চুক্তি সম্পাদনের বিষয়টা সুনিশ্চিত না হলেও সফর আর পেছাবে না। নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠনের পর শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় সফরে আর ভারতে যাননি। অবশ্য ভারতে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির স্ত্রী বিয়োগের পর শেষকৃর্তানুষ্ঠানে যোগদানের জন্য প্রধানমন্ত্রী ১২ ঘণ্টার এক সংক্ষিপ্ত ব্যক্তিগত সফরে দিল্লি গিয়েছিলেন।
গোয়ার ব্রিকস-বিমসটেক আউটরিচ সম্মেলনেও প্রধানমন্ত্রী যোগদান করেছিলেন। গোয়ায় নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ হলেও এটা কোনো রাষ্ট্রীয় সফর ছিল না। অবশ্য ২০১৫ সালে ৬ ও ৭ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন। দীর্ঘ ৪২ বছর পূর্বে মুজিব-ইন্দিরা যে সীমান্ত চুক্তি ও ছিটমহল হস্তান্তর চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন তা কার্যকর করার বিষয় চূড়ান্ত চুক্তি হয়েছিল এ সফরের সময় এবং অল্প কিছুদিনের মাঝে চুক্তিটি কার্যকরও হয়েছিল।
২০১৫ সালের ৬ ও ৭ জুনের সফরের সময় পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও ঢাকায় এসেছিলেন। কিন্তু তিস্তার চুক্তিটি সম্পাদন করা সম্ভব হয়নি। মমতা ব্যানার্জি কথা দিয়েছিলেন তিনি খুব সহসা তিস্তার পানি চুক্তির বিষয়টি চূড়ান্ত করে দেবেন। কিন্তু তিনি কথা রাখেননি। অথচ তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে পানির প্রবাহ ৭/৮ শত কিউসেক এ নেমে আসায় বৃহত্তম রংপুর জেলায় প্রচণ্ড পানির অভাব হয়েছে এবং চাষাবাদও বিঘœ হচ্ছে। এ বিষয়টা বাংলাদেশ ফায়সালা করবে দিল্লির সঙ্গে। কিন্তু ভারতীয় শাসনতন্ত্রে বিদেশের সঙ্গে চুক্তি করতে হলে কোনো রাজ্যের স্বার্থের সঙ্গে চুক্তির বিষয় সংশ্লিষ্ট হলে সে রাজ্যের সম্মতিও নেয়ার বিধান থাকায় চুক্তিটি দিল্লি সরাসরি করতে পারছে না। এ চুক্তি সম্পাদন করা সম্ভবত খুব কঠিন হবে। কারণ মমতা ব্যানার্জি এ চুক্তির বিষয়ে কখনো সম্মতি দেবেন না।
গঙ্গাবাঁধের ব্যাপারে যে ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়েছিল তার থেকেও নাকি পশ্চিম বাংলা তার প্রতিনিধি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। গঙ্গাবাঁধেও নাকি তার সম্মতি নেই। অথচ গঙ্গা বাঁধ হবে বাংলাদেশের অংশে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ভাটিতে। বর্তমানে ফারাক্কা থেকে শুষ্ক মৌসুমে যে পানি বাংলাদেশ পায় তা দিয়েও ভাটিতে নদীগুলোর নাব্যতা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। বৃহত্তম খুলনার ভৈরব নদী, পশুর নদী পলি পরে নাব্যতা হারাচ্ছে। ইউনিসেফ বলেছে এ নদীগুলো নাব্যতা হারালে সুন্দরবনও নাকি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মংলায় বন্দর রয়েছে আবার পায়রায়ও নতুন বন্দর হচ্ছে। উভয় বন্দর ফারাক্কার কারণে নাব্যতার সংকটে পড়বে। সুতরাং পদ্মার শাখা নদীগুলোর নাব্যতা রক্ষা করতে হলে গঙ্গায় বাঁধ তৈরি করে বর্ষা মৌসুমে পানি সঞ্চয় করে রাখতে হবে যেন শুষ্ক মৌসুমে সঞ্চিত পানি ছেড়ে নদীগুলোর প্রবাহ রক্ষা করা যায়।
শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে যখন প্রথম ক্ষমতায় আসেন তখনই ভারতের দেবগৌড়া সরকারের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিটি সম্পাদন করেছিলেন। ওই চুক্তিতে বাংলাদেশ গঙ্গায় বাঁধ নির্মাণ করার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। চুক্তিটি সম্পাদন করা হয়েছে ২০ বছর গত হতে চলেছে। আর ১০ বছর বাকি। বাঁধ নির্মাণের কোনো উদ্যোগই নেয়া হচ্ছে না। অথচ বিভিন্ন দলে যে সব নেতারা নেতৃত্বে রয়েছেন তাদের মাঝে এমন কোনো সাহসী, উদ্যোগী লোক দেখছিনা যারা বাঁধ নির্মাণের মতো এত বড় একটা কাজের আঞ্জাম দিতে পারবেন। রাজস্ব তুলে রুটিন ওয়ার্ক করে দেশ চালানো আর সাহসের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশের অপরিসীম মঙ্গলে ব্রতী হওয়া তো এক কথা নয়।
শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়ে যা করেছেন তা বিরল ঘটনা। বাঁধের কাজও তাকে করতে হবে। আমরা আশা করি যে তিনি অচিরেই এ উদ্যোগটা নেবেন। জলসীমা নির্ধারণের বিষয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিল। তিস্তার ব্যাপারে সম্ভবত জাতিসংঘের শরণাপন্ন হতে হবে। কারণ পশ্চিমবঙ্গ কখনো পূর্ব বাংলার মঙ্গল কামনা করেনি। তারা পূর্ব বঙ্গের মানুষকে পক্ষী, পিশাচ, পাপিষ্ঠ, দস্যু, দাস, কুকুর, মেচ্ছ, ব্রাত্য ইত্যাদি বলে সম্বোধন করত। এমনকি বইয়ের পাতায় পাতায়ও এসব লিপিবদ্ধ আছে। তাদের বিশ্বাস পূর্ববঙ্গের মানুষ হাটু জলে বাস করা পক্ষিসাদৃশ যাযাবর জাত। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ পূর্ব-বাংলার জন্য অপরিসীম কল্যাণ ভয়ে আনত। কিন্তু তারা পূর্ব-বাংলাকে প্রদেশ আর ঢাকাকে রাজধানী মানতেই পারেনি। তাদের আন্দোলনের মুখে বঙ্গবঙ্গ ১৯১১ সালে দিল্লির দরবারে ব্রিটিশ রাজ রহিত করে দিয়েছিলেন।
জ্যোতিবসু পূর্ববঙ্গের সোনারগাঁয়ের সন্তান ছিলেন তাই গঙ্গা চুক্তিতে অকাতরে সাহায্য করেছিলেন এবং এ কারণে ৩০ বছরের দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তি করা সম্ভব হয়েছিল। মমতা তখন ওই চুক্তিরও বিরোধিতা করেছেন। পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির কাছ থেকে কখনও তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি প্রত্যাশা করা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তার কাছে ভারতের বড়ত্বের অহমিকাও রয়েছে। সুতরাং জাতিসংঘের দ্বারস্থ হওয়াই উত্তম হবে। তার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সম্পর্কও ভালো নয়। উত্তর প্রদেশে এখন বিধানসভার যে নির্বাচন হচ্ছে তাতে যদি নরেন্দ্র মোদির দল জিততে না পারে তবে নরেন্দ্র মোদি তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারাবেন।
বাংলাদেশে ভারতকে বড় কোনো সাহায্য করা সম্ভব না হলেও বাংলাদেশ ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় ৭টি রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নির্মূল করার ব্যাপারে যে সহযোগিতা প্রদান করেছে তার অপরিসীম মূল্য রয়েছে। বাংলাদেশে বৈরী সরকার থাকলে বিদ্রোহীরা অস্ত্র পায়, বাংলাদেশে আশ্রয় পায়, ট্রেনিং এর সুবিধা পায়। কিন্তু গত আট বছর শেখ হাসিনার সরকার থেকে অনুরূপ কোনো সহযোগিতাই বিদ্রোহীরা পায়নি। শেখ হাসিনার পূর্বের সরকারের প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে বলেছেন, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো স্বাধীনতা সংগ্রাম করছে। তিনি অস্ত্র পাচারের ব্যাপারে বিদ্রোহীদের প্রত্যক্ষ মদত দিতেন। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশে বিদ্রোহীদের ট্রেনিং দিতেন। উলফার বড় বড় নেতারা বাংলাদেশেই সপরিবারে অবস্থান নিয়েছিলেন। এখন এসব কর্মকাণ্ড কিছুই নেই যে কারণে গোটা পূর্বাঞ্চলে বিদ্রোহী গ্রুপগুলো নির্জিব হয়ে গেছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের নৌ ট্রানজিট সব সময় অব্যাহত ছিল। সম্প্রতি স্থল ট্রানজিটের সুবিধাও প্রদান করা হয়েছে। এখন ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে পূর্বাঞ্চলীয় ৭ রাজ্যে অতি দ্রুত সময়ের মাঝে মালামাল আসা-যাওয়া করতে পারছে। ত্রিপুরার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বড় বড় মেশিনারিজ গেল আশুগঞ্জের নৌবন্দর হয়ে। অবশ্য বাংলাদেশ ত্রিপুরার ধরাটানা বিদ্যুৎ কেন্দ্র
থেকে একশত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ক্রয় করেছে। অরুণাচল, সিকিম, নাগাল্যান্ড, মনিপুরে কোনো জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হলেও তার সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ বাংলাদেশ ক্রয় করে নিতে পারে। তাদের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রির বিকল্প কোনো বাজার নেই। ভুটানে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে তাও বাংলাদেশ কিনে নিতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় বহু চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নিরাপত্তা সম্পর্কীয় চুক্তির বিষয়ে নাকি আলাপ-আলোচনা হবে। আবার শোনা যাচ্ছে দেশরক্ষা সম্পর্কিত চুক্তি হওয়ারও নাকি সম্ভাবনা রয়েছে। মুজিব-ইন্দিরা ২৫ বছরের চুক্তি করেছিলেন। ভারত-রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলার সময় অনুরূপ একটা চুক্তি করেছিল। এই জন্য ইন্দিরা সরকার ভারতে সমালোচনারও সম্মুখীন হয়েছিল। তখন অনুরূপ কোনো চুক্তির প্রয়োজন ছিল না ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী যখন বাংলাদেশ সফরে আসেন তখন বাংলাদেশের সঙ্গে ২৫ বছরের ওই চুক্তিটি সম্পাদিত হয়। চুক্তিটি ছিল ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার ১৫ বছরের যে চুক্তি করেছিল ওই চুক্তির অনুরূপ।
সম্ভবত ভারতের মানুষের কাছে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির ব্যালেন্স করার জন্য ইন্দিরা বাংলাদেশের সঙ্গে অনুরূপ একটা চুক্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। চুক্তিটির মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর আর নবায়ন করা হয়নি। কিন্তু এ চুক্তিটিই ভারত বিরোধিতার হাতিয়ার হয়ে যায়। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মৃত্যুর পঠভূমিকাও রচনা করেছিল এ চুক্তিটি। সবাই বলতো এ চুক্তিটি নাকি গোলামির চুক্তি। সব রাজনৈতিক দলের ভাষা, দেয়ালের লিখন দিয়ে চুক্তিটি গোলামির চুক্তি হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে চিত্রিত হয়েছিল। অথচ এটা কখনো গোলামির চুক্তি ছিল না। এখনও ভারতবিরোধীরা ওতপেতে বসে আছে নিরাপত্তার নামে হোক আর সত্যিকারভাবে দেশরক্ষার নামে হোক যে কোনো চুক্তির নাম-নিশানা পেলেই গোটা দেশে তারা দেশ-বিক্রির ধ্বনি তুলবে। আমি আমার পূর্বের এক লেখায়ও এ বিষয়ে আলাপ করেছিলাম। সরকার এ বিষয়টার প্রতি যেন অমনোযোগী না হোন। নিরাপত্তার নামে হোক বা দেশ রক্ষার নামে হোক ভারতের সঙ্গে কোনো চুক্তিরই প্রয়োজন নেই।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

Leave a comment

ফেসবুকে আমরা

সর্বশেষ সংবাদ

উপরে