সালথায় তান্ডব এর জের আরো ১ জনের মৃত্যু

প্রকাশিত: ০৮-০৪-২০২১, সময়: ১৩:২০ |
Share This

বুলবুল ,সালথা (ফরিদগপুর) : ফরিদপুরের সালথায় উপজেলার বিভিন্ন সরকারি অফিস ও থানায় তান্ডবের ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। মামলায় ৮৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৪ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে সালথা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মিজানুর রহমান বাদী হয়ে এ মামলাটি দায়ের করেন।
এদিকে তা-বের ঘটনায় মিরান মোল্যা (৩৫) নামে আহত আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে। তিনি উপজেলার ভাওয়াল ইউনিয়নের দরজা-পুরুরা গ্রামের আব্দুর রব মোল্যার ছেলে। বুধবার দুপুরে ঢাকার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ জামাল পাশা। এরআগে এ ঘটনায় জুবায়ের হোসেন (১৮) নামে এক যুবক মারা যায়। এ নিয়ে মোট দুই যুবক মারা গেল।মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামাল পাশা বলেন, উপজেলা পরিষদ ভবন, ভূমি অফিস, মুক্তিযোদ্ধা ভবন ও থানা এলাকায় তা-বের ঘটনায় ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছে। মামলার এজাহারভুক্ত আসামিসহ ২১ জনকে ইতিমধ্যে আটক করা হয়েছে।এদিকে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্রোর ও বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাংচুর এর ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধকালিন কমান্ডার বাচ্চু মাতুব্বর বাদি হয়ে সালথা থানায় অন্য আরো একটি মামলা করেছেন বলে জানা গেছে। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের গোপালিয়া গ্রামের ক্বারী ইনছুর শেখের ছেলে মোঃ নুর শেখ (১৮), বিনোকদিয়া গ্রামের করিম কাজীর ছেলে মোঃ সজিব কাজী (১৯), ইউসুফদিয়া গ্রামের শাহজাহান মাতুব্বরের ছেলে রাব্বি মাতুব্বর (১৯), মিনাজদিয়া গ্রামের আব্দুল মোতালেবের ছেলে মোঃ ইউনুস মাতুব্বর (৬০), ও গোপালিয়া গ্রামের সালাম মোল্যার ছেলে আমির মোল্যা (৩০)। অন্যরা হলেন, ফুকরা গ্রামের সুলতান শেখের ছেলে আবুল কালাম শেখ (৩৫), রিপন শেখ (৩২), ইসরাইল মোল্যার ছেলে ইলিয়াস মোল্যা (২৭), চিলারকান্দা গ্রামের খালেক শেখের ছেলে শহিদুল শেখ (৩২), পিসনাইল গ্রামের গ্রামের ঝিলু ফকিরের ছেলে মোঃ রুবেল ফকির (২৫), সোনাপুর গ্রামের মিজানুর শেখের ছেলে মোঃ রাকিবুল ইসলাম (১৮) ও বিনোকদিয়া গ্রামের আইয়ুব মোল্যার ছেলে মোঃ সাইফুল ইসলাম (১৮) সহ নাম না-জানা আরো ককেজন। জেলা প্রশাসক অতুল সরকার জানিয়েছেন, সালথার তা-বের ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যর দুটি কমিটি করা হয়েছে। এর একটি প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোছা. তাসলিমা আলীকে অপর কমিটির প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোঃ আসলাম মোল্যাকে। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে এই দুই কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে সালথার ওই রাতের ধংসযজ্ঞ শেষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও এলাকার অবস্থা এখনো থমথমে। উপজেলা পরিষদজুড়ে এখন পড়ে আছে শুধুই ক্ষত-বিক্ষত চিহ্ন। উপজেলা সদরের বাতাসে পোড়া গন্ধ, ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা কাঁচ আর আসবাবপত্রের টুকরা। মানুষের চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ। টানা তিনঘণ্টা তান্ডবে লন্ডভন্ড উপজেলা পরিষদ এলাকা। ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় বিপুল সংখ্যাক পুলিশ, র‌্যাব ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।স্থানীয়রা বলেন, সোমবার রাতে চালানো তান্ডবের ঘটনা এখনও চোখে ভাসছে। স্থানীয় সাধারন মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তাহারা বলেন, সালথা দাঙ্গপ্রবন এলাকা হলেও এমন ঘটনা কখনো ঘটতে দেখিনি। এই ধরনের ভয়াবহ তা-ব প্রথম দেখলাম।
এসব ধংসযজ্ঞ দেখতে আজ বৃস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে আসার কথা রয়েছে আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একটি উচ্চ পর্যায়ের দল। কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি এর নেতৃত্বে সরোজমিনে তারা আসবেন ঘটনার বিস্তারিত জানতে। উল্লেখ্য গত সোমবার সন্ধ্যায় উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের ফুকরা বাজারে লকডাউনের কার্যকারিতা পরিদর্শনে যান উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মারুফা সুলতানা খান হিরামণি। এ সময় সহকারী কমিশনারের উপস্থিতিতে মানুষ ছুটাছুটি করে। পরে স্থানীয়রা জড়ো হয়। মানুষের ভীড় দেখে এসিল্যান্ড ফুকরা বাজার থেকে চলে আসেন। পরে হেফাজতের জনৈক এক আলেমকে আটক করা হয়েছে, এমন গুজব ছড়িয়ে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১২ পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ উপজেলা চত্বরে দেশীয় অস্ত্র ঢাল-কাতরা ও লাঠিসোটা নিয়ে প্রবেশ করে বিভিন্ন সরকারি দফতর ও থানায় এই তা-ব চালায়। মধ্যযুগীয় কায়দায় হামলাকারিরা ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, তাদের এই হামলায় রক্ষা পায়নি উপজেলা পরিষদ চত্বরের গাছপালা ও বঙ্গবন্ধুর মুর‌্যাল। এতে সালথা উপজেলা সদর এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। তান্ডব চলাকালে ইউএনও-এসিল্যান্ডের দুটি সরকারি গাড়ি সম্পর্ণ পুড়িয়ে দেয় তারা। এছাড়াও সাংবাদিকের একটি মোটর সাইকেলসহ তিনটি মোটর সাইকেল ভাঙচুর করা হয় ও দুটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৫৮৮ রাউন্ড শট গানের গুলি, ৩২ রাউন্ড গ্যাস গান, ২২ টি সাউন্ড গ্রেনেডএবং ৭৫ রাউন্ড রাইফেলের গুলি ছোড়া হয়। এসময় পুলিশ ও র‌্যাবের ৮জন সদস্য আহত হয়।
সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ হাসিব সরকার বলেন, সরকারের নির্দেশনা রয়েছে সন্ধ্যা ৬টার পরে কোন দোকান পাট খোলা থাকবে না। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে বাজার তদারকিতে ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মারুফা সুলতানা খান হিরামনি। ফুকরা বাজারে গেলে সেখানে উত্তেজিত জনতা লকডাউন মানবে না বলে জানালে তিনি এলাকা ছেড়ে চলে আসেন। পরে অফিসে ফিরে পুলিশকে জানালে পুলিশ গিয়ে তাদের নিবারনের চেষ্টা চালায়। তারা পুলিশের উপরও হামলা করে। পরবর্তীতে বাজারে একটি গুজব ছড়ায় পুলিশ ইসলামের বিরুদ্ধে কাজ করে। এছাড়া একজন হুজুরকে ধরে নিয়ে গেছে এবং তাকে মেরে মেলেছে। এই গুজব ছড়িয়ে একটি ধমার্ন্ধ গোষ্টি একত্রিত হয়ে এসে হামলা করে। তিনি বলেন আমাদের উপজেলার প্রতিটি অফিসে মধ্যেযুগীয় কায়দায় হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ও মুক্তিযোদ্ধা ভবনে হামলা করে তারা। আমরা মনে করি স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্টি এই হামলা করে গুজব রটিয়েছে।

ফেসবুকে আমরা

সর্বশেষ সংবাদ

উপরে