দ্রুত বিচার করা হচ্ছে চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার

প্রকাশিত: ০৪-০৩-২০১৭, সময়: ০৬:৪১ |
Share This

নিউজ ডেস্ক, ঢাকা : আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পাঠানো হয়েছে হাইকোর্টে।

এর মধ্যে কিছু মামলার শুনানি শুরু হয়েছে এবং কার্যতালিকায় রয়েছে আরো কয়েকটি।

এসব মামলা হচ্ছে সিলেটের শিশু রাজন ও খুলনার রাকিব হত্যা, পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে বোমা হামলা মামলা, পুলিশ দম্পতি মাহফুজুর রহমান, দর্জি দোকানি বিশ্বজিৎ দাস ও পিলখানা হত্যা মামলা। রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে ব্লগার রাজীব হত্যা মামলা।

আপিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তা খালাফ এস আলী হত্যা মামলা। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার পেপারবুক প্রস্তুতের জন্য নথি পাঠানো হয়েছে বিজি প্রেসে। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানিয়েছে, চলতি বছরের মধ্যে এসব মামলার বিচার হাইকোর্টে সম্পন্ন হতে পারে।

হাইকোর্টের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার (প্রশাসন ও বিচার) মো. সাব্বির ফয়েজ বলেন, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছেন। ওই নির্দেশ মোতাবেক এসব মামলার তালিকা করে দ্রুত পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়েছে এবং হচ্ছে। পেপারবুক প্রস্তুতের পরই মামলা দ্রুত শুনানির জন্য নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়।

প্রধান বিচারপতির অনুমোদন পেলেই হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স বেঞ্চে শুনানির জন্য মামলা পাঠানো হয়ে থাকে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু মামলা দ্রুত শুনানির জন্য পাঠানো হয়েছে। দ্রুত নিষ্পত্তির এ উদ্যোগ     নেওয়ায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, নিহতদের স্বজন ও দেশবাসীকে বিচারের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হবে না।

২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে হামলা চালায় জঙ্গিরা। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলা নিম্ন আদালতে নিষ্পত্তি হতে পেরিয়ে যায় এক যুগের বেশি সময়। এই মামলায় ২০১৪ সালের ২৩ জুন ঢাকার একটি আদালত হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নেতা মুফতি হান্নানসহ আটজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং যাবজ্জীবন দণ্ড দেয় ৬ জনকে। মৃত্যুদণ্ডের এ রায় অনুমোদনের জন্য নথি ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে।

এছাড়া খালাস চেয়ে আপিল করেন আসামিরা। দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষে সুপ্রিম কোর্টের উদ্যোগে বিশেষ ব্যবস্থায় প্রস্তুত করা হয় পেপারবুক। এরপরই শুনানির জন্য বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চে পাঠানো হয় মামলাটি। ইতোমধ্যে এ মামলায় আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেছে। ১৪ মার্চ অ্যাটর্নি জেনারেলের সমাপনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শেষ হবে শুনানি। এরপরই রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করবে হাইকোর্ট।

২০১৫ সালে তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দেশবাসীকে স্তম্ভিত করে। এর মধ্যে দুটি ঘটনার শিকার হন দুইজন সিলেটের শিশু রাজন ও খুলনার রাকিব। অপরটিতে পুলিশের বিশেষ শাখার (রাজনৈতিক) পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান। এই দম্পতি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাদেরই মেয়ে ঐশী রহমানকে গত বছরের ১২ নভেম্বর ঢাকার একটি আদালত মৃত্যুদণ্ড দেয়। এখন ডেথ রেফারেন্স ও ঐশীর আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের ডিভিশন বেঞ্চের কার্যতালিকার চার নম্বর ক্রমিকে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

একই বেঞ্চের কার্যতালিকার দুই ও তিন নম্বর ক্রমিকে যথাক্রমে রয়েছে রাজন ও রাকিব হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল। দুটি মামলারই শুনানি শুরু হয়েছে। শুরুতে রাকিব হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শুরু হয়। এরপর কিছুদিন শুনানির পর মুলতবি রাখা হয়েছে মামলাটি। এখন শুনানি চলছে রাজন হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের।

রাকিব হত্যা মামলার আসামি পক্ষের অন্যতম কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট গোলাম মোহাম্মদ চৌধুরী আলাল ইত্তেফাককে বলেন, আশা করি চলতি মাসেই মামলার শুনানি শেষ হবে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা দায়ের পর রাজনের ১৪ কার্যদিবস এবং ১০ কার্যদিবসের মধ্যে রাকিব হত্যার বিচার শেষ করে আদালত। গত ৮ নভেম্বর পৃথক দুটি আদালত বিচারের রায়ে প্রধান আসামি কামরুল ও শরীফসহ ৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর বিএনপির ডাকা সকাল-সন্ধ্যা অবরোধের সময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ভেবে পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কের সামনে ছাত্রলীগের একদল কর্মী বিশ্বজিেক পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে। এই মামলায় সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ৮ জনকে ফাঁসি ও ১৩ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের পেপারবুক প্রস্তুতের পরই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলাটি শুনানির নির্দেশ দেন প্রধান বিচারপতি। পরে বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চে শুনানির জন্য পাঠানো হয় এটি।

হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানি সালের ক্রম অনুসারে হয়ে থাকে। হাইকোর্টে বর্তমানে ২০১১/২০১২ সালের ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি চলছে। সালের ক্রম অনুযায়ী চাঞ্চল্যকর ওইসব হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্সের শুনানি হতে কমপক্ষে ৫/৬ বছর পর্যন্ত অর্থাত্ ২০২২ সাল অপেক্ষা করতে হত।

কিন্তু অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ায় দ্রুতই এইসব মামলার বিচার শেষ হবে বলে জানিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, কনডেম সেলে ফাঁসির আসামিরা মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকেন। যত দ্রুত এ ধরনের মামলা নিষ্পত্তি হবে ততই আসামিদের জন্য মঙ্গল।

পেপারবুক প্রস্তুত হচ্ছে সাত খুন মামলার

২০১৫ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ সাতজনকে অপহরণ ও হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড দেয় আদালত। এ রায় অনুমোদনের জন্য মামলাটির ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। প্রধান বিচারপতির নির্দেশে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলাটির পেপারবুক প্রস্তুত হচ্ছে বিজি প্রেসে। এদিকে রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে হত্যার দায়ে গত মঙ্গলবার জেএমবির পাঁচ জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। মৃত্যুদণ্ডের এই রায় অনুমোদনের জন্য নথি হাইকোর্টে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। এই মামলার পেপারবুক অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রস্তুতের জন্য অনুমোদন নেওয়া হতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে।

রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ ব্লগার রাজীব হত্যা মামলা

ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিল রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। শুনানি গ্রহণ করে গত ৯ জানুয়ারি মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেনের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ। এখন যে কোনো দিন মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য কার্যতালিকায় আসতে পারে। ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পল্লবীতে নিজ বাসার সামনে ব্লগার রাজীবকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া শুনানির শেষ পর্যায়ে রয়েছে পিলখানা হত্যা মামলার ১৫২ আসামির ডেথ রেফারেন্স ও আপিল।

এদিকে সৌদি দূতাবাস কর্মকর্তা খালাফ এস আলী হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের শুনানি মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত হবে। আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহহাব মিঞার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে এটি শুনানির জন্য রয়েছে। ২০১২ সালের ৫ মার্চ খুন হন খালাফ। ওই বছরের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪ পাঁচ জনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। ২০১৩ সালে হাইকোর্ট এক রায়ে সাইফুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে । তিন জনকে যাবজ্জীবন ও খালাস দেওয়া হয় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে। হাইকোর্টের রায়ের অংশ বিশেষ বাতিল চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। ওই আপিল এখন নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।

Leave a comment

ফেসবুকে আমরা

সর্বশেষ সংবাদ

উপরে