যৌতুক নির্যাতনে গৃহবধু হত্যা ঘটনার শুরু থেকেই পুলিশের গড়িমসির অভিযোগ পরিবারের

কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি : অর্থনীতিতে অনার্স-মাষ্টার্স প্রথম শ্রেনীতে উত্তীর্ন তাসমীম আক্তার মীম। পরিবারের অমতেই নিজের পছন্দে বিয়ে করেছিলেন। নিজের পায়ে দাঁড়াতে প্রস্তুতি নিচ্ছিল চাকরীর পরীক্ষায় উত্তীর্ন হতে। কিন্তু তার আগেই ঘাতক স্বামী ও ডাইনী শাশুড়ীর নির্মম হিং¯স্রতার শিকার হয়ে জীবনের পরীক্ষায় উত্তীর্ন হয়ে গেলো মীম। একমাত্র কণ্যার শোকে বিহ্বল পিতা স্কুল শিক্ষক মহিবুল আলম খেদোক্তি করলেন এভাবেই। ‘আমি এখন বিচারের অপেক্ষায় দিন গুনছি, খুনিদের গ্রেফতার দাবি করছি’।
গৃহবধু মীমের পিতার অভিযোগ, ‘ঘটনার শুরু থেকেই কোন কিছু সত্য-মিথ্যার বাছ-বিচার না করেই ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালাতে চেয়েছে দৌলতপুর থানা পুলিশ’। গত বছর ০১ সেপ্টেম্বর বিকেলের ঘটনায় লিখিত এজাহার নিয়ে সন্ধার দিকে দৌলতপুর থানায় গেলে সেখানে ওসি তদন্ত পুলিশ পরিদর্শক নিশিকান্ত আমাকে বলেন, ‘আপনার মেয়ে আত্মহত্যা করেছে, এখানে আমাদের কিছু করার নেই’। এই বলে ফিরিয়ে দেন আমাকে’। অথচ মীমের উপর ঘটে যাওয়া নির্মম নির্যাতনের সত্য-মিথ্যা তদন্ত করেও দেখলেন না পুলিশ। দীর্ঘ ১৪দিন ঢাকা মেডিকেলে মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে হেরে যাওয়া মীমের সুরৎহাল রিপোর্টে শাহবাগ থানা পুলিশ নির্যাতনে মৃত্যুর প্রাথমিক কারন উল্লেখ করেন। একই ভাবে গত ১৯ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. সোহেল মাহমুদ স্বাক্ষরিত ময়না তদন্ত রিপোর্টে সুষ্পষ্ট ভাবে এটাকে হত্যাকান্ড হিসেবে নিশ্চিত করেছেন’।
একমাত্র কণ্যা হারানো ক্যান্সারাক্রান্ত মীমের মা তাজমা খাতুন অভিযোগ করেন, ‘মীমের মৃত্যুর একদিন পর ১৫ সেপ্টেম্বর দৌলতপুর থানা পুলিশ হত্যা মামলা রেকর্ড করলেও এখন পর্যন্ত ঘটনার সাড়ে ৪ মাসের মধ্যে মামলার তদন্তে নানাভাবে গড়িমসি করছেন। হত্যাকান্ডে জড়িত মীমের স্বামী দৌলতপুর উপজেলার তাড়াগুনিয়া গ্রামের মৃত: জিন্না মোল্লার ছেলে এজাজ আহমেদ বাপ্পী এবং শ^াশুড়ী কোহিনুর বেগকে গ্রেফতার করেনি পুলিশ। আমি বেঁচে থাকতে মেয়ে হত্যার বিচার দেখে যেতে চাই’।
তাজমা খাতুন বলেন, বিয়ের পর মাস না পেরোতেই মীম তার স্বামী শ^াশুড়ীর আসল চেহারা দেখতে পায়। আমরা বিষয়টা জানার পর মীমকে বলেছিলাম ওখান থেকে চলে আয়। কিন্তু মীম বলেছিলো, ‘মা মেয়েদের বিয়ে তো একবারই হয়, তোমরা আমাকে অন্য কোথাও বিয়ে দিলে সেখানেও যে আমি সুখী হবো এমন কোন গ্যারান্টি নাই, বরং এখানেই চেষ্টা করে দেখি এরা পরিবর্তন হয় কি না’। একমাত্র মেয়ের সুখের জন্যে বিয়ের পর নগদ টাকাসহ অন্তত: ১০লক্ষ টাকার উপহার দিয়েছি অথচ দাবিকৃত মটর সাইকেলটি দিতে না পারায় সৃষ্ট পারিবারিক কলহের নির্যাতন চলছিলো মীমের উপর। এর সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছিলো শ^াশুড়ী কোহিনুর বেগমের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় মীম দেখে ফেলা। এতে আরও একটি নতুন জটিলতার সৃষ্টি হয়। ঘটনার দিন স্বামীর নির্যাতন ও শাশুড়ীর অকথ্য ভাষায় আমাদের উদ্দেশে গালি গালাজ করার জবাবে মীমও তার শ^াশুড়ীর চরিত্র তুলে কথা বলেছিলো যা আমি সংযোগে থাকা মোবাইল ফোনে শুনতে পায়। এসময় স্বামীর সাথে শ^াশুড়ীও ছেলের সাথে যুক্ত হয়ে মীমের উপর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে’।
নিহত মীমের মামা এমএম মুন্না দাবি করেন, ‘মীম হত্যা মামলার আসামী এজাজ আহমেদ বাপ্পী নিয়মিত ফেসবুকসহ বিভিন্ন স্যোস্যাল মিডিয়ায় এক্টিভ দেখছি; তার ফোনও মাঝে মধ্যে খোলা পাওয়া যায় অথচ পুলিশ নাকি আসামীর কোন সন্ধানই পাচ্ছেন না। আজকের যুগে তথ্য প্রযুক্তির এতো অপশন থাকতেও পুলিশ তাদের অবস্থান সনাক্ত করতে পারেনা এটা কেউ বিশ^াস করবেন ? আমার বিশ^াস এখানে তদন্তকারী কর্মকর্তা বা পুলিশের ব্যক্তিগত কোন ইন্টারেষ্ট আছে; তা নাহলে এমনটি হওয়ার কথা নয়’।
মানবাধিকার কর্মী তাজনিহার বেগম বলেন, ‘আমরা কোন পরিস্থিতিতে জীবন-যাপন করছি বুঝতে পারছি না, যে কোন ধরণের হত্যাকান্ড বা সহিংস ঘটনার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অর্পিত দায়িত্ব হিসেবেই তার সুষ্ঠু তদন্ত করবেন, এবং ন্যায় বিচার নিশ্চিত করবেন, এটাই আইন, অথচ নারীর উপর সংঘটিত সহিংসতার পর সেটাকে নানা ভাবে ভিন্ন খাতে ঠেলে দেয় পুলিশ। এটা খুব দু:খজনক। গৃহবধু মীম হত্যাকান্ডের শুরু থেকেই পুলিশের নানা অবহেলা ও গড়িমসির অভিযোগ করে আসছেন তার পরিবার। এই হত্যাকান্ডের সাড়ে ৪মাস অতিক্রম করলেও এর কোন কুলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ। না তদন্ত কাজের শেষ, না জড়িতদের গ্রেফতার। এই সময়টাই আমাদের প্রমান দিচ্ছে এঘটনায় পুলিশের গড়িমসির সত্যতা আছে। ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ ও ন্যায় বিচারের দাবিতে একাধিকবার মানব বন্ধন করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও কিছু হচ্ছেনা’। অবিলম্বে জড়িতদের গ্রেফতার ও হত্যাকান্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনসহ চার্যশীট দেয়ার দাবি করেন এই মানবাধিকার কর্মী।
এবিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দৌলথপুর থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক অরুন কুমার এর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে দৌলতপুর থানার ওসি তদন্ত সাহাদত হোসেনের সাথে মুঠোফোনে মীম হত্যা মামলার তদন্তে অগ্রগতি বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মীম হত্যা মামলার সুরৎহাল রিপোর্ট ও ময়না তদন্ত রিপোর্ট আমরা পেয়েছি। এটা যেহেতু মার্ডার, তাই আসামী ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে, ‘আসামীর কাছ থেকেও আমাদের জানতে হবে কিভাবে এই হত্যাকান্ড ঘটেছে। সে কারণে চার্যশীট দিতেও একটু বিলম্ব হচ্ছে’। বিগত দিনের মতো এই পুলিশ কর্মকর্তাও দাবি করলেন, ‘খুব শীঘ্রই আমরা আসামী ধরতে পারব বলে আশা করছি’।

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



Comments are closed.

সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



সম্পাদক ও প্রকাশক : ডাঃ আওরঙ্গজেব কামাল
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : ইজ্ঞি: মোঃ হোসেন ভূইয়া।
বার্তা সম্পাদক : জহিরুল ইসলাম লিটন
যুগ্ন-সম্পাদক : শামীম আহম্মেদ

ঢাকা অফিস : জীবন বীমা টাওয়ার,১০ দিলকুশা বানিজ্যিক (১০ তলা) এলাকা,ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ ০১৭১৬-১৮৪৪১১,০১৯৪৪২৩৮৭৩৮

E-mail:dnanewsbd@gmail.com

ওয়েবসাইট নির্মানে: আইটি হাউজ বাংলাদেশ