মুক্তিযুদ্ধ কোনো ব্যক্তিস্বার্থের হাতিয়ার ছিল না

ডেস্ক রিপোর্ট :এখন থেকে ঠিক একবছর আগে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে রাজাকারের যে তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, তা ছিল মুক্তিযুদ্ধ উত্তর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সবচেয়ে নির্দয় পরিহাস। তালিকাটি প্রকাশিত হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের ভেতর যে প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করেছি তা ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব। আমি নিজে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ছাড়াও স্বজন হারানোর বেদনাও আছে আমাদের পরিবারের। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম দেখে আমার মুক্তিযোদ্ধা বড় ভাইয়ের চেহারায় যে ক্ষোভ ও বেদনামিশ্রিত দৃশ্য আমি দেখেছি তা কোনো অনুভূতি দিয়েই প্রকাশ করা সম্ভব নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এমন পরিহাসে যারা জড়িত ছিলেন তারা কতটুকু লজ্জিত হয়েছেন জানি না, তবে বাঙালি হিসেবে আমরা লজ্জিত হয়েছি। তারপরও যখন দেখি নিজেদের ভুলত্রুটি অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয় তখন আশ্চর্য হই বৈকি। প্রশ্ন উঠতে পারে, যে ঘটনা একবছর আগেই শেষ হয়ে গেছে সে প্রসঙ্গ এখন টেনে আনার উদ্দেশ কী? ভুল স্বীকার করার পরও এসব প্রসঙ্গ টেনে তালিকা প্রস্তুতকারীদের কি বিব্রত করা হচ্ছে না? সহজ উত্তর, বিব্রতবোধ করাটাই তো স্বাভাবিক। রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে যে অমার্জনীয় অপরাধ তারা করেছেন সে তুলনায় বিব্রতবোধ হওয়া খুবই সামান্য বিষয়। রাজাকারের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের যে কঠিন আঘাত তারা দিয়েছেন, একটি ছোট্ট উদাহরণ দিলেই তা বোঝা যাবে। তালিকায় নাম আসায় বরগুনার পাথরঘাটার বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুল হক ও তার পরিবারের স্বজনরা বলেছেন, ‘আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছি তাদের নাম রাজাকারের তালিকায় প্রকাশ করে আমার ও আমার স্বজনদেরই শুধু মানসম্মান ক্ষুণ্ন করা হয়নি, পুরো জাতির সঙ্গেই করা হয়েছে তামাশা। এখন এ তালিকা সংশোধন করা হলেও কি আমরা মানসম্মান ফিরে পাব?’ কোটি টাকার প্রশ্ন! মজিবুল হকের এ প্রশ্নের জবাব কী? আমি নিশ্চিত বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবুল হক আজও সেই প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাননি।
মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য হিসেবে এমন অনেক মৌলিক প্রশ্নের জবাব আমরাও খুঁজে ফিরছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছয় কি সাত বছর হবে। ছোট হলেও মুক্তিযুদ্ধকালীন অনেক স্মৃতিই আমার মনে আছে। আমার ইমিডিয়েট বড়ভাই ফরিদ বাশার যিনি ‘৭১-এ মেট্রিক পরীক্ষার্থী ছিলেন। তার বয়স তখন কত হবে? পনেরো কি ষোলো বছর। আমার সেই ভাই একদিন কাউকে না জানিয়ে আমাদের আড়াইহাজার উপজেলার শম্ভূপুরা গ্রাম থেকে একদল মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে আগরতলা পাড়ি জমালেন। খবর পাওয়ার পর আমার এক চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে আড়াইহাজার থানার বৃহৎ বাণিজ্য অঞ্চল গোপালদীতে ছুটে গেলাম যদি ভাইকে ফিরিয়ে আনা যায়! গ্রামেরই কেউ একজন বলেছিলেন গোপালদী বাজারে ঢাকা থেকে আগত কয়েকজন বন্ধুদের সঙ্গে নাকি তিনি ফরিদ ভাইকে দেখেছেন। আমরা পৌঁছতে পৌঁছতে ভাই আমার নাগালের বাইরে। ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসার পর আমার মা’র সে কি কান্না। আমরা তখন গ্রামের বাড়িতেই থাকি। ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর ২৭ মার্চ যখন দুই ঘণ্টার জন্য কার্ফু তুলে নিয়েছিল, সে সুযোগে আমরা ঢাকার আরামবাগের বাসা থেকে আমাদের গ্রামের বাড়িতে চলে আসি। আমার এখনও মনে আছে, কান্না করতে করতে আমার মা বেহুশ হয়ে পড়েছিলেন। মাথায় পানি ঢেলে সুস্থ হলে ভাই ফিরে এসেছে কিনা জিজ্ঞেস করেন। ফিরে আসেননি শুনে আবারও অজ্ঞান হয়ে যান। এভাবেই এক সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমার মা’র অসুস্থ হওয়ার কারণও ছিল। ফরিদ ভাই আগরতলা চলে যাওয়ার আগেই আমার সেজো ভাই এএমএম রশিদউদ্দিন মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে নাম লিখিয়েছেন। পর পর দুই সন্তান এভাবে মুক্তিযুদ্ধে চলে যাওয়ায় আমার মা নিজেকে সামলাতে পারছিলেন না। আরও একটি কষ্ট ছিল তার; আমাদের পরিবারের সবচেয়ে বড় সন্তান, আমার বড় বোন, কিছুদিন আগেই সুদূর সৈয়দপুর থেকে সদ্য বিধবা হয়ে ফিরেছেন। পাক হায়নার দল বড় বোনের স্বামীকে এপ্রিলের ১ তারিখ সৈয়দপুর সেনানিবাসের বাসা থেকে সেই যে ধরে নিয়ে গেছে, তারপর তার কোনো খোঁজ আমরা পাইনি। তিনি বেঁচে আছেন কিনা তাও আমরা নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। স্বাধীনতার পর অবশ্য আমরা বোনের স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছি। আমার ভগ্নিপতি সৈয়দপুর সেনানিবাসে তখন কর্মরত ছিলেন। বড় বোন স্বামীকে হারিয়ে দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে সৈয়দপুর থেকে ফিরে এসেছিলেন। এতসব উল্লেখ করার একটাই কারণ, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা এই যুগল শব্দ আমাদের পরিবারের প্রতিটি সদস্যের হৃদয়ে গেঁথে আছে। তাই কোনো অমর্যাদা হলে প্রথম আঘাতটাই আমাদের বুকে এসে বিদ্ধ হয়। আমার বিশ্বাস আমাদের পরিবারের মতো অনেকেই এসব ন্যক্কারজনক ঘটনায় আহত হন।
আমার আরও একটি প্রশ্ন; মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরি করতে গিয়ে যে হাজার হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার পরিচয় বেরিয়ে আসছে তাদের নিয়ে কর্তৃপক্ষের কী পরিকল্পনা? সমাজের বিভিন্ন স্তরে এসব ভুয়া লোকের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। সমাজের নীচু স্তর থেকে সমাজের উঁচু পর্যায়ে এমন অনেক ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা এখনও দাপটের সঙ্গে চলাফেরা করছে। প্রশ্ন হল, তারা কি এত সহজেই পার পেয়ে যাবেন? যেসব ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে রাষ্ট্রের সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে পরবর্তীতে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন তারা কি আজীবন ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবেন? তাদের বিরুদ্ধে কি কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হবে না? মুক্তিযোদ্ধার সনদ ভুয়া প্রমাণিত হওয়ার পরও সরকারের সাবেক পাঁচ সচিবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং তাদের স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষকের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ উঠেছিল। তাদের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা জানি না। পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্যও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা প্রমাণিত হওয়ার পর সরকার কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কিনা আজও আমরা জানতে পারিনি। সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা দেননি, এমন অভিযোগও পাওয়া গিয়েছিল প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় ১৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। তাদেরও শেষ পর্যন্ত আইনের আওতায় আনা হয়নি। অথচ সরকারি প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট ঘোষণা ছিল কেউ যদি মুক্তিযোদ্ধা হন তাহলে তাকে চাকরির শুরুতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করলে তা গ্রহণ করা হবে না।আমি প্রায়ই আমার মুক্তিযোদ্ধা ভাইকে বলতে শুনি, ‘আমরা কোনো ব্যক্তি স্বার্থের জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়িনি। আমাদের তখন একটাই উদ্দেশ্য ছিল, যে কোনো মূল্যে এ দেশকে শত্রুমুক্ত করা। জীবন বিপন্ন করে হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনই ছিল আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য।’ কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দান-অনুদানের যে ব্যবস্থা চালু হয়েছে তাতে আমাদের মর্যাদা কতটুকু বৃদ্ধি পেয়েছে জানি না। তবে এতটুকু বুঝেছি কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষ সময় ও কালকে তাদের ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের মহান আত্মত্যাগকে অমর্যাদা করেছে। দিব্য চোখে তাদের দেখতে পেলেও তারা থাকেন আইনের দৃষ্টিসীমার বাইরে। কিন্তু তাই বলে আমাদের বসে থাকলে চলবে না। কেউ করুক বা না করুক; রাজাকারের বিষয়ে জাতি যেমন ঐক্যবদ্ধ হয়ে ব্যবস্থা নিয়েছে, কারও জন্য অপেক্ষা না করে কথিত স্বার্থবাদীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যতদিন না এসব পঙ্কিলতা দূর করা যাবে ততদিন মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা ফিরে আসবে না। তারিখ ধরে উৎসব পালন করলেই মর্যাদা দেয়া হয় না। মর্যাদা দিতে হলে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি মিনিট-প্রতিটি মুহূর্তকেও উপলব্ধি করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধারাই এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বলে শুধু মুখে উচ্চারণ করলেই চলবে না; একই সঙ্গে তাদের শ্রেষ্ঠ আসনেও বসাতে হবে। তাদের সেই আসন তখনই নিশ্চিত হবে, যখন ক্ষুদ্র স্বার্থে ব্যবহার না করে, প্রকৃত অর্থেই তাদের আমরা সামনের সারিতে বসাতে পারব।

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



Comments are closed.

সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



সম্পাদক ও প্রকাশক : ডাঃ আওরঙ্গজেব কামাল
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : ইজ্ঞি: মোঃ হোসেন ভূইয়া।
বার্তা সম্পাদক : জহিরুল ইসলাম লিটন
যুগ্ন-সম্পাদক : শামীম আহম্মেদ

ঢাকা অফিস : জীবন বীমা টাওয়ার,১০ দিলকুশা বানিজ্যিক (১০ তলা) এলাকা,ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ ০১৭১৬-১৮৪৪১১,০১৯৪৪২৩৮৭৩৮

E-mail:dnanewsbd@gmail.com

ওয়েবসাইট নির্মানে: আইটি হাউজ বাংলাদেশ