পোলট্রি শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ০২-০৩-২০১৭, সময়: ১৮:৪৩ |
Share This

প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত পোলট্রি শিল্প। এ খাত বিকাশের পথে একটা সময় বড় সংকটের জায়গা ছিল ‘একদিনের বাচ্চা’। দেশে উৎপাদিত বাচ্চায় পুরো চাহিদা না মেটায় একসময় অবৈধ পথে ভারত থেকে আসত মুরগির বাচ্চা। তবে এখন মুরগির বাচ্চা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ কো-অর্ডিনেশন কমিটি (বিপিআইসিসি) সূত্রে জানা গেছে, দেশের খামারগুলোয় প্র্রতি সপ্তাহে একদিনের লেয়ার, ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির বাচ্চার চাহিদা ৯৫ লাখ থেকে ১ কোটি ১০ লাখ, যার পুরোটাই এখন দেশে উৎপাদন হচ্ছে। আর বাচ্চা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার ফলে কয়েক বছর ধরে ১৮-২০ শতাংশ হারে বাড়ছে ডিম ও মুরগির মাংস উৎপাদন।

সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে দেশে মুরগির বাচ্চার সাপ্তাহিক উৎপাদন ছিল ৯০ লাখ। ২০১৫ সালে তা বেড়ে ৯৯ লাখে দাঁড়ায়। ২০১৬ সালে তা আরো বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ১০ লাখে। এর মধ্যে লেয়ার ও ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা উৎপাদন করছে বেসরকারি খাত, আর সোনালি মুরগির বাচ্চা উৎপাদন করছে সরকারি প্রতিষ্ঠান।

দেশে বর্তমানে প্রায় ৭০ হাজার ছোটবড় খামার রয়েছে। এসব খামারের ডিম ও মুরগির মাংস উৎপাদন বাড়াতে প্রতিনিয়ত একদিনের বাচ্চা সরবরাহ করছেন দেশের উদ্যোক্তারা।

এ বিষয়ে কাজী ফার্মস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী জাহেদুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ বাড়ছে। অন্যদিকে নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে আশঙ্কাজনক হারে কমছে আবাদি জমি। তাই ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টিনিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে পোলট্রি খাত। আর একদিনের বাচ্চা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কারণে পোলট্রি খাতের বিকাশের পথ আরো সুগম হলো। তবে এ খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিনের বাচ্চার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের ওপর ভর করে বিগত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে মুরগির মাংস উৎপাদন। দেশের খামারগুলোয় ২০১৪ সালে যেখানে দৈনিক ১ হাজার ৫১০ টন মুরগির মাংস উৎপাদন হতো, ২০১৬ সালে তা বেড়ে ১ হাজার ৮৫১ টনে দাঁড়িয়েছে। ২০৩০ সালে মুরগির মাংসের দৈনিক উৎপাদন ৩ হাজার ৩০০ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া রয়েছে।

মাংসের পাশাপাশি বেড়েছে ডিম উৎপাদনও। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে ডিমের উৎপাদন ছিল ১ হাজার ১৭ কোটি পিস। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ১ হাজার ৯৯ কোটি ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ হাজার ১৯১ কোটি পিসে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ও পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য অধ্যাপক ড. এমএ সাত্তার মণ্ডল এ প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশের মোট খাদ্য সরবরাহের ১০ দশমিক ৩১ শতাংশ মাংস ও ডিম আসে পোলট্রি খাত থেকে। এ সাফল্য ধরে রাখতে দেশের খামারিদের প্রতিনিয়ত প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি নীতিসহায়তা দিতে হবে। ভোক্তারা যাতে নিরাপদ মাংস ও ডিম খেতে পারে, সেজন্য বাজার ও বিপণন ব্যবস্থা আরো আধুনিক করতে হবে।

একদিনের বাচ্চা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (বিএবি) তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে ছোটবড় প্রায় ২০০টি হ্যাচারি ও সাতটি জিপি (গ্র্যান্ড প্যারেন্ট) ফার্ম রয়েছে। বড় জিপি ফার্মের মধ্যে অন্যতম হলো প্যারাগন, আফতাব, নারিশ, কাজী, সিপি, এমএম আগা ও রাশিক পোলট্রি অ্যান্ড হ্যাচারি।

ওয়ার্ল্ডস পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখার (ওয়াপসা-বিবি) সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ বলেন, ২০২১ সালে ডিমের মাথাপিছু ভোগ ৫১ থেকে বেড়ে ৮৫তে উন্নীত হবে এবং মুরগির মাংসের মাথাপিছু ভোগ ৪ দশমিক ২ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ৫ কেজিতে উন্নীত হবে। এ সময়ে ডিম ও মুরগির মাংসের ভোগ সঠিক পরিমাণে ধরে রাখতে হলে একদিনের মুরগির বাচ্চা সরবরাহ ঠিক রাখতে হবে।

পোলট্রি খাত একটি বিকাশমান শিল্প হলেও তা এখনো ঝুঁকিহীন নয় বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, হরতাল-অবরোধে খাতটি সবচেয়ে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া মুরগিতে রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা অনেক সময় বিপাকে ফেলে দেয়। এখনো এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে নীতিসহায়তার পর্যাপ্ত ঘাটতি রয়েছে।

এ বিষয়ে প্যারাগন পোলট্রি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিপিআইসিসির সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, সাশ্রয়ী মূল্যে ভোক্তার কাছে সব ধরনের ডিম ও মুরগির মাংসের নিশ্চয়তা দিতে চাই। কিন্তু এক্ষেত্রে সরকারের নীতিগত সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার, এআইটি প্রথা তুলে দেয়া, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ লো-প্যাথজনিক ভাইরাসের ভ্যাকসিন আমদানি স্বল্প সময়ের জন্য অনুমোদন দেয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৬ ও বিপিআইসিসির তথ্যমতে, দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষ চাহিদার ৪৫ শতাংশ এখন পোলট্রি খাতনির্ভর। খাতটিতে বিনিয়োগ ছাড়িয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। আত্মকর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের। তবে উন্নত বিশ্বের তুলনায় বাংলাদেশের মানুষ ডিম ও মাংস গ্রহণে বেশ পিছিয়ে রয়েছে। তাই বাংলাদেশে পোলট্রি খাতের মাধ্যমে মাংস ও ডিমের চাহিদা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) মহাপরিচালক ডা. মো. আইনুল হক বলেন, পোলট্রি খাত মাঝেমধ্যে নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেই বড় হচ্ছে। কয়েক বছরের মধ্যে এ খাতে একদিনের বাচ্চা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা দেশের বড় একটি অর্জন। এক্ষেত্রে সরকারের নীতিসহায়তার

পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ভিশনের কারণেই এ সফলতা এসেছে। তাই উদ্যোক্তাদের সফলতাকে গুরুত্ব দিতে খাতসংশ্লিষ্টদের সুযোগ-সুবিধাগুলো বিবেচনা করা হচ্ছে।বণিকবার্তা

Leave a comment

উপরে