বাংলাদেশ রেলওয়ে’র আজ ১৫৮ তম বছর

চিত্তরঞ্জন সাহা চিতু, চুয়াডাঙ্গা সংবাদদাতা : বর্তমান বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে চুয়াডাঙ্গার বুক চিরেই সর্বপ্রথম রেলপথ স্থাপিত হয়েছিল। ১৮৫৯ সালে কলকাতা থেকে চুয়াডাঙ্গা হয়ে কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের লক্ষ্যে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি গঠিত হয়। এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পদ্মা নদীর ওপর দিয়ে রেল লাইন স্থাপন করে সুদূর ঢাকা পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারিত করা।
ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৮৬২ সালে রেলপথ নির্মাণ সম্পন্ন করে। রানাঘাট থেকে চুয়াডাঙ্গা হয়ে কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেলপথ নির্মিত হওয়ার পর ১৮৬২ সালের এই দিনে (১৫ নভেম্বর) এই রেলপথ চালু হয়। আজ তার ১৫৮ বছর পূর্তি হলো।
প্রথম রেলের ইঞ্জিন ছিল বাষ্পচালিত আর বগীগুলো ছিল কাঠের তৈরি। এই রেললাইন স্থাপন ও প্রথম রেল চলাচল প্রসঙ্গে নদীয়ার ইতিহাস গবেষক শ্রী কুমুদনাথ মল্লিক তাঁর ‘নদীয়া কাহিনী’তে লিখেছেন :
‘স্যার সিসিল বাহাদুরের শাসনকাল নানারূপে নদীয়ায় স্মরণীয় হইয়া রহিয়াছে। ইঁহারই সময় ইস্টারন বেঙ্গল রেলওয়ে কলিকাতা হইতে নদীয়ার উত্তর সীমা কুষ্টিয়া পর্যন্ত— প্রথম খোলা হয়। কার্যত এই রেল খুলিবার প্রায় দশ বৎসর পূর্ব্বে ১৮৫২-৫৩ খ্রিস্টাব্দে ইহার নিমিত্ত প্রথম প্রস্তাব উত্থিত হয়। তদনুসারে ১৮৫৪ অব্দে লেফটেন্যান্ট গ্রেট হেড নামক একজন দক্ষ এনজিনিয়ার কলিকাতা হইতে ঢাকা, তথা হইতে চট্টগ্রাম ও তথা হইতে আকোয়াব পর্যন্ত জরিপ করিতে নিযুক্ত হন।
ইতিমধ্যে মিষ্টার পাউন নামে একজন এনজিনিয়ার কলিকাতা হইতে কুষ্টিয়া পর্যন্ত পথের নক্সা ও পদ্মার উপর একটি ব্রীজের আদর্শ অঙ্কন করিয়া গভর্ণমেণ্টে পেশ করেন। তদানুসারে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুলাই ১৪৭৫৯৬৭২ পাউণ্ড মূলধনে লণ্ডনে ইস্টারণ বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি গঠিত হয়। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর তারিখে ঐ পথের কন্ট্রাক্ট বিলি হয়। পরে ১৮৬২ অব্দের ১৭নভেম্বর তারিখে ঐ পথে প্রথম যাত্রী গাড়ী চলিয়াছিল।
পরবর্তী শাসনকর্ত্তা সার রিভার টমসনের সময় ১৮৭৭ অব্দের ১লা এপ্রিল এই রেল গভর্ণমেণ্টের খাস অধীনে আসে এবং ইহার ইস্টারন বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে নামকরণ হয়।
যেদিন প্রথম এই রেলপথে লৌহশকট চলিয়াছিল, সেদিন এক অদৃষ্টপূর্ব্ব ব্যাপার সংঘটিত হইয়াছিল। দলে দলে আবাল বৃদ্ধ বনিতা দুরান্তর হইতে আসিয়া লাইনের দুই ধারে শ্রেণীবদ্ধ হইয়া গাড়ির প্রত্যাশায় দাঁড়াইয়া থাকে এবং অনেকেই কিরূপে লৌহশকট অত লোক ও গাড়ী লইয়া অত দ্রুত আসিবে সে বিষয়ে বিলক্ষণ সন্দেহ প্রকাশ করিতে থাকে।
তাহাদের মধ্যে যাহারা পূর্ব্বেই, আই.আরের গাড়ী দেখিয়াছিল, তাহারা অনেক বুঝাইলেও অন্যান্য সকলে কিছুতেই যতক্ষণ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ না করিয়াছিল ততক্ষণ এই অদৃষ্টপূর্ব্ব ব্যাপারে বিশ্বাস স্থাপন করিতে পারে নাই!
পরে যখন বংশীধ্বনি করিয়া প্রথম গাড়ী দেখা দিল- ঐ সমবেত সোৎসুক জনসমুদ্র বিশেষ কৌতুহলী হইয়া আনন্দ মিশ্রিত এক কোলাহল উত্থাপিত করিল এবং স্ত্রীলোকগণ কল্যাণ সূচক হুলুধ্বনি দিতে লাগিল। এইরূপে ই.বি. লাইন প্রথম কৌতুহলী জনসঙ্গ কর্ত্তৃক সম্বর্দ্ধিত হইয়া দেশ মধ্যে ক্রমবিস্তার লাভ করিয়া আসিতেছে।
যখন প্রথম ই.বি. লাইন খোলা হয়, তখন গাড়ীতে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ এই চারি শ্রেণী বিদ্যমান ছিল। স্ত্রীলোকগণের নিমিত্ত স্বতন্ত্র গাড়ীর বন্দোবস্ত থাকিলেও সমৃদ্ধ ঘরের স্ত্রীলোকগণ সাধারণের সহিত তখন গাড়ীতে উঠিতেন না। তাঁহাদের পালকী, গাড়ীতে উঠাইয়া দেওয়া হইত। তখন নদীয়ার মধ্যে কাঁচড়াপাড়া, চাকদহ, রাণাঘাট, বগুলা, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া এই কয়টি স্টেশনে প্রধানত যাত্রী ও মাল যাতায়াত করিত।’
১৯০৯ সালে পদ্মা নদীর ওপর ৫,৯০০ ফুট দীর্ঘ হার্ডিঞ্জ ব্রিজ তৈরির কাজ শুরু হয়। ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ এই ব্রিজটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এই সেতুর ওপর দু’টো ব্রডগেজ লাইন আছে। এর ওপর দিয়ে রেলপথ সম্প্রসারিত হওয়ার ফলে দার্জিলিং মেল কলকাতা থেকে উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোর ওপর দিয়ে সুদূর শিলিগুড়ি পর্যন্ত চলাচল করতো।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর বাংলাদেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী বনগাঁ-রানাঘাট এবং রানাঘাট-দর্শনা রেলপথ ভারতের অংশে পড়ায় যশোর ও খুলনা জেলার সঙ্গে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই রেলপথের পুনঃসংযোগের জন্য ১৯৫১ সালের ২১ মার্চ দর্শনা থেকে সাবদালপুর পর্যন্ত ১১৪ মাইল দীর্ঘ নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হয়।
বাংলাদেশ থেকে রেলপথে ভারতে যোগাযোগের জন্য দর্শনা রেলওয়ে টার্মিনাল হচ্ছে তোরণদ্বার। চুয়াডাঙ্গা জেলার দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে আনসারবাড়িয়া আর উত্তর প্রান্তে আলমডাঙ্গা শেষ রেলস্টেশন। এর মধ্যবর্তী রেল স্টেশনগুলো হলো : দর্শনা হল্ট, দর্শনা, জয়রামপুর, গাইদঘাট, চুয়াডাঙ্গা, মোমিনপুর (নীলমনিগঞ্জ) ও মুন্সীগঞ্জ।
ছবি পরিচিতি : প্রথম ছবিটি জিরো পয়েন্ট-এর : ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গেদে রেলস্টেশন; এপারে দর্শনা। এখান থেকেই বাংলাদেশ অংশে রেললাইনের সূচনা। এরপর বর্তমান বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের প্রথম রেলস্টেশন চুয়াডাঙ্গা। এই স্টেশনের ওভারব্রিজের বিশেষত্ব হচ্ছে এর মধ্যবর্তী কোনো স্তম্ভ নেই (পুরোটাই ঝুলন্ত)। চুয়াডাঙ্গার কৃতিসন্তান অবিভক্ত নদীয়া জেলার প্রথম মুসলমান প্রকৌশলী এম. এ. বারী পূর্ববঙ্গ রেল বিভাগের মহাব্যবস্থাপক থাকাকালে বিশেষ নকশার এই ওভারব্রিজটি তৈরি করে নিজ পিতৃভূমির স্টেশনে স্থাপন করেন। এর পরের ছবিটি মুন্সীগঞ্জ রেলস্টেশন-এর। চুয়াডাঙ্গা জেলায় দু’টি রেল স্টেশন আছে- যা রেলওয়ের খরচে নয়, বরং ব্যক্তি অনুদানে ১৮৭৫-১৮৭৬ সাল নাগাদ নির্মিত। মুন্সীগঞ্জ (জেহালা সংলগ্ন) এলাকার ২৭ পাড়ার জমিদার ছিলেন মুন্সী আমির আলী। তাঁরই নামানুসারে মুন্সীগঞ্জ নামকরণ এবং নিজ গ্রাম থেকে ট্রেনে ওঠার অভিপ্রায়ে তিনি নিজ খরচে এই রেল স্টেশনটি তৈরি করান। ব্যক্তিগত অনুদানে নির্মিত আরেকটি রেল স্টেশন হলো জমিদার নীলমনি মৈত্র-এর নামানুসারে নীলমনিগঞ্জ- যা বর্তমানে মোমিনপুর রেলস্টেশন নামে পরিচিত। সর্বশেষ ছবিটি আলমডাঙ্গার দোতালা রেলস্টেশন-এর। এটিই বাংলাদেশের একমাত্র রেলওয়ে স্টেশন- যেখানে ট্রেন থামে স্টেশনের দোতলা বরাবর।

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



Comments are closed.

সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



সম্পাদক ও প্রকাশক : ডাঃ আওরঙ্গজেব কামাল
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : ইজ্ঞি: মোঃ হোসেন ভূইয়া।
বার্তা সম্পাদক : জহিরুল ইসলাম লিটন
যুগ্ন-সম্পাদক : শামীম আহম্মেদ

ঢাকা অফিস : জীবন বীমা টাওয়ার,১০ দিলকুশা বানিজ্যিক (১০ তলা) এলাকা,ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ ০১৭১৬-১৮৪৪১১,০১৯৪৪২৩৮৭৩৮

E-mail:dnanewsbd@gmail.com

ওয়েবসাইট নির্মানে: আইটি হাউজ বাংলাদেশ