সরকারি সংস্থার দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়হীনতার বলি শতাধিক সেতু ও সড়ক

প্রকাশিত: ০২-০৩-২০১৭, সময়: ১৮:৩৯ |
Share This

বরিশাল সদর উপজেলার চাঁদপুরা ও চরমোনাই ইউনিয়নের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে কড়াইতলা নদীর ওপর ২০১৪ সালে একটি সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করে স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। কিন্তু সেতুটি নির্মাণ হলে বরিশাল, ভোলাসহ আটটি রুটে লঞ্চ চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হবে জানিয়ে এলজিইডিকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। এর পর থেকে এক বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ হয়ে আছে সেতুটির নির্মাণকাজ।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের বড় নয়াগাঁও, ছোট নয়াগাঁও ও দুধঘাটা গ্রামের ওপর দিয়ে বিগত বিএনপি সরকারের আমলে একটি পাকা সড়ক নির্মাণ করে এলজিইডি। সড়কটি ব্যবহারের জন্য বড় নয়াগাঁও গ্রামে খালের ওপর একটি সেতু নির্মাণ জরুরি। কিন্তু খালটির জায়গা সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) অধিগ্রহণ করা সম্পত্তি হওয়ায় খালের ওপর সেতু নির্মাণে এলজিইডিকে বাধা দিচ্ছে সওজ। সরকারের এ দুটি সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে সেতুটি নির্মাণ।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের কাজ মূলত সওজ ও এলজিইডি করে থাকে। তবে নদ-নদীর ওপর সেতু নির্মাণের জন্য বিআইডব্লিউটিএর অনুমোদন নিতে হয় প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে। কোনো কারণে সরকারের এসব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা দেখা গেলে আটকে যায় প্রকল্পের কাজ। বর্তমানে এভাবেই আটকে আছে শতাধিক সেতু ও সড়কের কাজ।

সমন্বয়হীনতার বিষয়টি স্বীকার করে এলজিইডির পরিকল্পনা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুর সাদিক বণিক বার্তাকে বলেন, উন্নত বিশ্বে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয় জেলা ও উপজেলা পর্যায় থেকে। কিন্তু আমাদের দেশে তা হয় রাজধানী থেকে। মূলত সঠিক পরিকল্পনার অভাবেই সৃষ্টি হয় সমন্বয়হীনতা।

সাধারণ মানুষের দাবির মুখে ২০০৮ সালে পটুয়াখালীর গলাচিপা-কলাগাছিয়া সড়কের লোহালিয়া নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয় এলজিইডি। ৪৬৪ মিটার দৈর্ঘ্যের এ গার্ডার সেতুটির নির্মাণকাজ ২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু সেতুটির ৫৫ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর ২০১৪ সালের ১ অক্টোবর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্তে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়া হয়।

এ বিষয়ে পটুয়াখালী এলজিইডির এক কর্মকর্তা জানান, সেতুর উচ্চতায় বিআইডব্লিউটিএর অনুমোদন ছিল ৯ দশমিক ৫৭ মিটার। সে অনুযায়ী নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে লোহালিয়া সেতু অনুমোদনের সময় পায়রা বন্দরের কথা বিবেচনা করা হয়নি, যা বর্তমানে হচ্ছে। কারণ পায়রা সমুদ্র বন্দরের জন্য লোহালিয়া নদীর মূল চ্যানেলে ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স (নদীর পানির সর্বোচ্চ স্তর থেকে সেতুর উচ্চতা) ১৮ দশমিক ৩০ মিটার প্রয়োজন। লোহালিয়া সেতুর কম উচ্চতা হওয়ায় পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দরের স্বার্থে সেতুটির নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠকের পর সেতুটির উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে উচ্চপর্যায় থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পেলে নির্মাণকাজ শুরু করা হবে।

প্রায় দেড় মাস আগে মালবাহী ট্রাকসহ ভেঙে পড়ে চট্টগ্রামের নাজিরহাট পৌরসভাধীন নাজিরহাট-কাজিরহাট সড়কের মন্দাকিনি খালের ওপর স্থাপিত মন্দাকিনি বেইলি ব্রিজটি। কিন্তু এলজিইডি ও সওজের সমন্বয়হীনতার কারণে এখনো এটি মেরামত হয়নি। এতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে ওই সড়কে চলাচলকারী লক্ষাধিক মানুষকে।

সুনামগঞ্জ জেলা শহর থেকে সড়কপথে আমবাড়ি বাজার-কাটাখালী বাজার হয়ে ছাতকের দূরত্ব ৩০ কিলোমিটার। এ রাস্তার সুনামগঞ্জ শহরের শেষ প্রান্ত থেকে কাটাখালী বাজার এলাকা পর্যন্ত রাস্তা সওজের। কাটাখালী বাজার থেকে ছাতক পর্যন্ত এলজিইডির। সড়কটির আমবাড়ি বাজার এলাকা থেকে কাটাখালী বাজার পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এখন স্থানীয়দের বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলা উন্নয়ন সভায় এ নিয়ে একাধিকবার আলোচনা হলেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে এখনো সড়কটি মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। একইভাবে এলজিইডি এবং সওজের রশি টানাটানিতে সাড়ে আট মাস ধরে বন্ধ আছে রংপুরের বদরগঞ্জের চিকলি নদীর মোস্তফাপুর ঘাটে বেইলি ব্রিজের কাজ।

নির্মাণের আট বছরের মাথায় ঝুঁকির মুখে পড়েছে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী ধলাই নদের ওপর নির্মিত সিলেট বিভাগের দীর্ঘতম সেতুটি। সেতুর মধ্যবর্তী অংশে অন্তত সাতটি স্থানে বড় আকারের ফাটল দেখা দিয়েছে। সওজ বলছে, সেতুর কর্তৃপক্ষ স্থানীয় এলজিইডি। অন্যদিকে এলজিইডির দাবি, সেতুর কর্তৃপক্ষ তারা নয়। দুই সংস্থার এমন গড়িমসিতে সংস্কার হচ্ছে না সেতুটি।

বান্দরবান-চিম্বুক-আলীকদম-আলীক্ষ্যং-বাইশারী-নাইক্ষ্যংছড়ি-চাকঢালা-ঘুমধুম পর্যন্ত ১৯৭ কিমি একটি রাস্তা সওজ দাবি করায় ২০০৩ সাল থেকে এলজিইডির উন্নয়নকাজ থেকে বঞ্চিত পার্বত্য এ চার উপজেলার লাখো মানুষ। সম্প্রতি এ সড়কের আওতাভুক্ত নাইক্ষ্যংছড়ি-দক্ষিণ চাকঢালা এলাকায় উন্নয়নকাজের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই, খুঁটি স্থাপন, সার্ভে জরিপ, জমি অধিগ্রহণ সম্মতি, নকশা প্রণয়ন ও সমীক্ষার কাজ শেষ করেছে এলজিইডি। দরপত্র আহ্বানও প্রক্রিয়াধীন। এ অবস্থায় সওজের আপত্তির কারণে এলজিইডির গুছিয়ে আনা কাজ ভেস্তে গেছে। সড়কটির উন্নয়নকাজে সওজ বাধা সৃষ্টি করেছে বলে এলজিইডির দাবি।

এ বিষয়ে সওজের পরিচালক (সড়ক গবেষণাগার) ড. মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, এলজিইডি ও সওজ একই ধরনের কাজ করে থাকে। কিন্তু আইনেই আমাদের ও এলজিইডির কাজের জায়গাগুলো ভাগ করে দেয়া আছে। এর পরও যখন এলজিইডির কিছু কাজ আমাদের জায়গায় পড়ে যায়, তখন সরকারিভাবে তা অধিগ্রহণ করার নিয়ম রয়েছে। আমরা সবাই যদি এ নিয়মের মধ্যে থাকি, তাহলে সমন্বয়হীনতা বা দ্বন্দ্ব কোনোটিরই সুযোগ থাকে না।বণিকবার্তা ।

Leave a comment

ফেসবুকে আমরা

সর্বশেষ সংবাদ

উপরে