১৯ প্রকল্প সংশোধন ব্যয় বেড়েছে সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা

মোঃ মনিরুল হক : চলতি অর্থবছরের ৬৩ দিনে সংশোধন হয়েছে ১৯টি উন্নয়ন প্রকল্প। এগুলোর মধ্যে ১৮টিতেই ব্যয় বেড়েছে মূল অনুমোদিত ব্যয়ের চেয়ে ১৩ হাজার ৪১১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। কোনোটি সংশোধন করতে হয়েছে চতুর্থবার। সংশ্লিষ্টদের দাবি, করোনা মহামারী, রেট সিডিউল পরিবর্তন, আবহাওয়া, নতুন অঙ্গ অন্তর্ভুক্তি এবং বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পের একাধিক সংশোধন করতে হচ্ছে। তবে অনেকে মনে করেন, সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি ও সম্ভাব্যতা যাচাই না করাসহ নানা কারণে প্রকল্প সংশোধন যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে বাস্তবায়নের সময় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে ব্যয়ও। তাছাড়া সময়মতো সুফল পাচ্ছেন না প্রকল্পের উপকারভোগীরা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান শনিবার যুগান্তরকে বলেন, এ কথা অবশ্যই ঠিক যে প্রকল্পগুলো যদি সময়মতো শেষ করা যেত, তাহলে বাড়তি সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা হয়তো ব্যয় লাগত না। বাড়তি ব্যয় আমরা কেউই চাই না। কিন্তু বাস্তব অবস্থার কথাও ভাবতে হবে। একটি প্রকল্পে বিভিন্ন সংস্থা বা এজেন্সি জড়িত থাকে। তাদের মধ্যে অনেক সময় সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। তাছাড়া আমাদের দেশের মুদ্রা বিনিময় হারও একটি অন্যতম কারণ। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় শুরুতে যে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়, সেটি আর ঠিক থাকে না। তবে জেনেশুনে কারও ব্যক্তিগত ব্যর্থতায় যদি প্রকল্পের বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়, সেটি গভীরভাবে দেখা উচিত। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব। কোভিড-১৯ এর কারণে অনেক প্রকল্প এখন সংশোধন করতে হচ্ছে। ফলে চতুর্থবারও সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে।সূত্র জানায়, ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের ৬৩ দিনে মোট ৭টি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এগুলোয় ৪৮টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। যার মধ্যে ১৯টি সংশোধনী প্রস্তাব আর বাকি ২৮টি নতুন প্রকল্প। সংশোধিত প্রকল্পগুলোর ১৮টির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১৭ হাজার ৪৪২ কোটি ৪১ লাখ টাকা। কিন্তু বর্তমানে সংশোধিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ৮৫৪ কোটি ৯ লাখ টাকা। ফলে ব্যয় বেড়েছে ১৩ হাজার ৪১১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সাবেক সচিব আবুল মনসুর মো. ফয়েজ উল্লাহ বলেন, ঢালাওভাবে এই বাড়তি ব্যয়কে অপচয় বলা যাবে না। কেননা অধিকাংশ প্রকল্পেই দেখা যায় বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে নতুন নতুন অঙ্গ যোগ করতে হয়। ফলে প্রকল্প সংশোধন করতে হয়। কেননা সম্ভাব্যতা যাচাই করা হলেও সেগুলো থাকে প্রাথমিক ধারণা। তাছাড়া কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি থাকতে পারে। তবে বাস্তব কিছু সমস্যার কারণেও প্রকল্প সংশোধন করতে হয়। তিনি জানান, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, এখন থেকে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ প্রয়োজনে অন্য কোনো সংস্থা অর্থাৎ তৃতীয় পক্ষ দিয়ে করাতে হবে। এতে প্রকৃত অবস্থা উঠে আসবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রকল্প সংশোধন করতে হয়, কারণ শুরুতেই প্রকল্প ধারণার মধ্যে ঘাটতি থাকে। অর্থাৎ গোড়ায় সমস্যা থেকে যায়। তাছাড়া অনেক সময় পরিকল্পনা সঠিক থাকলেও ভূমি অধিগ্রহণ ও প্রকল্প পরিচালকসহ অন্যান্য কারণেও দেরি হয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে- এসব প্রকল্প আর যেন সংশোধন করতে না হয়। আমাদের সম্পদ সীমিত। ভেবে-চিন্তে খরচ করতে হবে। এক্ষেত্রে কম্প্রোমাইজ করা যাবে না।
কয়েকটি একনেক বৈঠকের কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ৬ জুলাই অনুমোদন পেয়েছে ‘ইনস্টলমেন্ট অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন’ প্রকল্পটি। এটির মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৪ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৫ হাজার ৪২৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এবার দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে ১ হাজার ১৪২ কোটি টাকা বাড়িয়ে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৫৬৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা। প্রকল্পটি ২০১৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা ছিল। কিন্তু সেটি সম্ভব না হওয়ায় এখন ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া ১ সেপ্টেম্বর অনুমোদন পেয়েছে আধুনিক খাদ্য সংরক্ষণাগার প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব। এটির মূল ব্যয় ছিল ১ হাজার ৯১৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যয় না বাড়লেও এবার দ্বিতীয় সংশোধনীতে ১ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা বাড়িয়ে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫৬৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। সেই সঙ্গে বাস্তবায়নের সময় বেড়েছে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, যেনতেনভাবে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েই পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্টরা হাজির হন সংশোধনের জন্য। এতে বাস্তবায়নের সময় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যয় যেমন বাড়ে, তেমনি আবার সময়মতো কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হন প্রকল্পের উপকারভোগীরা। এই ব্যয় বৃদ্ধির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
সংশোধিত অন্য প্রকল্পগুলো হল- আমার বাড়ি আমার খামার, ঘোড়াশাল তৃতীয় ইউনিট রি-পাওয়ারিং প্রকল্প এবং গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পাঁচপীর বাজার-চিলমারী উপজেলা সদরের সঙ্গে সংযোগ সড়কে তিস্তা নদীর উপর ১৪৯০ মিটার দীর্ঘ পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণ প্রকল্প। এছাড়া রূপগঞ্জ জলসিঁড়ি আবাসন সংযোগকারী সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। জামালপুর ও শেরপুর জেলার পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন। অ্যাস্টাবলিস্টমেন্ট অব গ্লোবাল মেরিটাইম ডিসট্রেস অ্যান্ড সেফটি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটেড মেরিন নেভিগেশন সিস্টেম স্থাপন। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নসহ নর্দমা ও ফুটপাথ নির্মাণ। বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, রংপুর জোন প্রকল্প। খুলনা শিফইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন। কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও ভ্রূণ স্থানান্তর প্রযুক্তি বাস্তবায়ন (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্প।

Comments

comments

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



Comments are closed.

সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



সম্পাদক ও প্রকাশক : ডাঃ আওরঙ্গজেব কামাল
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : ইজ্ঞি: মোঃ হোসেন ভূইয়া।
বার্তা সম্পাদক : জহিরুল ইসলাম লিটন
যুগ্ন-সম্পাদক : শামীম আহম্মেদ

ঢাকা অফিস : জীবন বীমা টাওয়ার,১০ দিলকুশা বানিজ্যিক (১০ তলা) এলাকা,ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ ০১৭১৬-১৮৪৪১১,০১৯৪৪২৩৮৭৩৮

E-mail:dnanewsbd@gmail.com

ওয়েবসাইট নির্মানে: আইটি হাউজ বাংলাদেশ