কুষ্টিয়ায় ১হাজার ৬শ কোটি টাকার গরু-ছাগল নিয়ে বিপাকে খামারী ও চাষীরা

মুকুল খসরু, কুষ্টিয়া থেকে : দেশীয় পদ্ধতিতে গরু/ছাগল পালনের অন্যতম জেলা কুষ্টিয়ার খামারী ও চাষীরা চরম বিপাকে করোনাকালীন প্রভাবে। তৃণমূল প্রান্তিক চাষী কিংবা খামারীরা প্রতি বছরই ধারদেনা করে খাইয়ে এসব গরু/ছাগল পালন করেন বছর শেষে কিছু আর্থিক সঞ্চয়ের লক্ষ্যে। কিন্তু বিদ্যমান পরিস্থিতির সংকটে আটকে গেছে তাদের গরু বিক্রয়। এতে চরম হতাশা ও শংকার মধ্যে দিন কাটছে তাদের। জেলার প্রানী সম্পদ বিভাগের তথ্যমতে এবছর কোরবানীর বাজারে বিক্রয়ের জন্য ১লাখ ৫হাজার গরু/মহিষ এবং ৭০হাজার ছাগল/ভেড়া উৎপাদন হয়েছে যার বাজার মূল্য প্রায় ১হাজার ৬শ কোটি টাকা। তবে এসব কোরবানীর পশু বিক্রয় নিয়ে খামারী ও চাষীদের মধ্যে একটা অনিশ্চয়তা ও আর্থিক ক্ষতির শংকা দেখা দিয়েছে। এমনকি এখাতে অর্থলগ্নিকারী ব্যাংক কর্তৃপক্ষও চিন্তিত তাদের ঋণ আদায় হবে কি না। মিরপুর উপজেলার সদরপুর গ্রামের কৃষক শহিদুলের স্ত্রী হাফিজা খাতুন বলেন, প্রতি বছরের ন্যায় এবারেও ৩টি দেশীয় জাতের ষাঁড় বড় করেছি। ঈদের আর মাত্র কিছুদিন বাকী আছে; অন্যান্য বছর এই সময়ের মধ্যে ঢাকা/চিটাগাং থেকে ব্যাপারীরা বাড়ির উপর এসে গরু কিনে নিয়ে যেতো। এবার তার কোন খোঁজই নাই। খাবারের দোকানে অনেক টাকা বাঁকী, গরু বেচে শোধ করার কথা। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কেউ গরু দেখতেও আসিনি। খুবই দু:শ্চিন্তায় আছি। ভেড়ামারা উপজেলার সলক মন্ডল জানান, “গুড় তো গুড়, গুড়ের বাটীশুদ্ধি গায়েব হওয়ার দশা’ গত বছর কোরবানীর ঈদের পর ৬ডা গরু কিনিচি সাড়ে ৪লাখ টাকায়, প্রতিটা গরুর জন্যি দিনে খাওয়া খরচ হয় আড়াইশ থেকে ৩শ টাকা। বছরে একটা গরু বড় করতি খরচই হয়ে যায় ৮০-৯০ হাজার টাকা। সমিতির ঋনের টাকা সুদসহ দিতি হবি, একন এই গরুর দাম ১লাখ বা ৯০হাজার কয়; তালি তো ঘড়বাড়ি বেচি সব টাকা শোধ করা লাগবিনি’। একদিকে খামারিরা ব্যাংক বা এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়েছেন অন্যদিকে প্রান্তিক চাষীরা নিজ বাড়িতে ১/২/৩টা করে গরু পালন করেছেন নিজের সুখ সাচ্ছন্দ ত্যাগ করে। তাদের দাবি প্রতি একটি গরুর খাওয়া বাবদ প্রতিদিন খচর করতে হয় ২শ থেকে ৩শ টাকা। নিজে খাও বা না খাও এই টাকা ধারকর্জ করে হলেও খরছ করতে হয়। লক্ষ্য বছর শেষে কোরবনীর বাজারে বিক্রয় করে আবার গরু পালনের প্রস্তুতি নেয়া। অন্যান্য বছর ঈদের ১৫-২০ দিন পূর্বেই জেলার বাইরে থেকে আগত ক্রেতা বা ব্যাপারীরা বাজার দরে সিংহভাগ গরু কিনে নিয়ে চলে যান। কিন্তু এবছর অর্ধেক দামেও বিক্রয়ের কোন লক্ষনই দেখছেন না তারা। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির শংকামুক্ত হতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন করছেন খামারা ও চাষীরা। মিরপুর উপজেলা পশু সম্পদ কর্মকর্তা ডা: মো: সোহাগ রানা বলেন, এবছর প্রান্তিক চাষীরা অন্যান্য বারের ন্যায় তাদের গরু/ছাগল স্বাভাবিক পদ্ধতিতে বিক্রয়ের সুযোগ সীমিত হওয়ার কারনে আদৌ তাদের বিক্রয়যোগ্য সব পশু বিক্রয় করতে পারবে কিনা সেই শংকায় আছেন প্রানী সম্পদ বিভাগও। অনেক খামারি ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণও নিয়েছেন। এছাড়া প্রান্তিক চাষীরা নিজ বাড়িতে ১/২/৩টা করে গরু পালন করেছেন নিজের সুখ সাচ্ছন্দ ত্যাগ করে। নিজে খাও বা না খাও ধারকর্জ করে হলেও খাওয়া খরছ করতে হয়। উপজেলায় এবছর সাড়ে ২১ হাজার গরু/মহিষ এবং প্রায় সাড়ে ৪হাজার ছাগল/ভেড়া আছে বিক্রয়যোগ্য। কুষ্টিয়া জেলা পশু সম্পদ কর্মকর্তা ডা: মো: সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এবছর কুষ্টিয়া জেলার ছয়টি উপজেলায় ১লক্ষ ৫হাজার গরু/মহিষ এবং ৭০হাজার ছাগল/ভেড়া আসন্ন কোরবানীর বাজারে বিক্রয়ের জন্য মোটা তাজা করে প্রস্তত করেছেন খামারী ও প্রান্তিক চাষীরা যার বাজার মূল্য প্রায় ১৬শ কোটি টাকা। স্বাভাবিক সময়ের হিসেব মতে, জেলার চাহিদা মেটাতে প্রয়োজন মোট পশুর ৩০%ভাগ। বাকী ৭০%ভাগ পশুই জেলার বাইরে বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সরবরাহ হয়ে থাকে। কিন্তু করোনাকালে স্বাস্থ্যবিধির বাধ্যবাদকতার কারণে এসব পশু বিক্রয় নিয়ে চাষীরা তাদের শংকার কথা জানিয়েছেন। তবে সরকারী উদ্যেগে অনলাইন পশু বিক্রয় সহযোগিতার আয়োজন থাকলেও প্রযক্তিগত অজ্ঞতার কারণে খুব কম সংখ্যক খামারী বা চাষী এসুযোগ কাজে লাগাতে পারছেন। ফলে তারা অনিশ্চয়তা ও শংকার মধ্যেই থেকে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক কুষ্টিয়ার মুখ্য আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মুনসুরুর রহমান জানান, পশু মোটা তাজাকরণ জেলা কুষ্টিয়ার খ্যাতি থাকায় লাভ জনক এখাতে বিভিন্ন ব্যাংক স্বল্প মেয়াদি ঋণ দিয়ে থাকেন। আমরাও দিয়েছি। এখাতে প্রায় ৬০ কোটি টাকা খামারীদের ঋণ দেয়া আছে। এছাড়া অন্যান্য ব্যাংক, এনজিও এবং অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানও ঋণ দিয়েছেন। প্রতি বছর ঈদের পরদিন এসব অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান প্রান্তিক পর্যায়ে কালেকশন বুথ স্থাপনে মাধ্যমে প্রদত্ত ঋণের টাকা সংগ্রহ করেন। ঋণ গ্রহিতা খামারী ও চাষীরাও উৎসাহের সাথে গৃহীত ঋনের টাকা পরিশোধ করে থাকেন। কিন্তু এবছর অনেক ঋন গ্রহিতা জানিয়েছেন তাদের ঋণ পরিশোধের অনিশ্চয়তার কথা। তবে তারা ইচ্ছা করলে সরকার ঘোষিত স্বল্পসুদে ৪%হারে সহায়তা নিয়ে তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে পারবেন।

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



Comments are closed.

সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



সম্পাদক ও প্রকাশক : ডাঃ আওরঙ্গজেব কামাল
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : ইজ্ঞি: মোঃ হোসেন ভূইয়া।
বার্তা সম্পাদক : জহিরুল ইসলাম লিটন
যুগ্ন-সম্পাদক : শামীম আহম্মেদ

ঢাকা অফিস : জীবন বীমা টাওয়ার,১০ দিলকুশা বানিজ্যিক (১০ তলা) এলাকা,ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ ০১৭১৬-১৮৪৪১১,০১৯৪৪২৩৮৭৩৮

E-mail:dnanewsbd@gmail.com

ওয়েবসাইট নির্মানে: আইটি হাউজ বাংলাদেশ