ভারত: ‘করোনায় না, পুলিশ-চিকিৎসকদের অবহেলায় মায়ের মৃত্যু

ডেস্ক রিপোর্ট : ১১ এপ্রিল, সকাল বেলা। মেডিকেল কর্মকর্তাদের একটি দল এসে সোহরাব ফারুকির পরিবারকে কোয়ারেন্টিন করে রেখে যান। এ সময় তাদের পরিবারের সদস্য ছিলেন ৯ জন।কিন্তু বুধবার সন্ধ্যায় যখন স্বাস্থ্যকর্মীরা ফিরে আসেন, তখন সেই পরিবারটির এক সদস্য দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন।
মুম্বাইয়ে হোটের ব্যবস্থাপনা নিয়ে লেখাপড়া করছেন ফারুকি। বসবাস করেন এশিয়ার সবচেয়ে বড় বস্তি ধারাবিতে। জায়গা সংকটের কারণে সেখানে পরিবারগুলোকে ঠাসাঠাসি করে থাকতে হচ্ছে।-খবর আল-জাজিরারসব মিলিয়ে করোনা বিস্তারের উর্বর ক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে এলাকাটি: এখন পর্যন্ত ৬০ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে, যাদের মধ্যে মারা গেছেন আট রোগী।ফারুকিদের বিপরীতে বাস করা এক প্রতিবেশী করোনা আক্রান্ত হন। কয়েক দিন আগে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।১০ এপ্রিল রাতে চিকিৎসা কর্মকর্তাদের একটি দল ফারুকিদের এলাকা পরিদর্শনে আসেন। আল-জাজিরাকে এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘চিকিৎসকরা জানালেন— আমরাও আক্রান্ত হয়েছি কিনা; তা নিশ্চিত হতে আমাদের করোনা পরীক্ষা করা দরকার।পর দিন খুব সকালে ফারুকি, তার বাবা-মা, বড় ভাই, ভাবী, তাদের দুই সন্তান ও দুই ভাগনেকে কোয়ারেন্টিনে রূপ দেয়া স্টেডিয়ামে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের বাড়ি থেকে যেটা এক কিলোমিটার দূরে।এই শিক্ষার্থী বলেন, কোয়ারেন্টিন ওয়ার্ড বলতে বিশাল একটি হল ঘর। সেখানে আমাদের ৩১ জনকে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এতগুলোর মানুষের জন্য দুটি বাথরুম। চরম অস্বাস্থ্যকর।এক কর্মকর্তাকে ফারুকি জিজ্ঞাসা করেন, তাদের এখানে কতদিন থাকতে হবে? কিন্তু তারা কোনো তথ্য দিতে পারেননি।‘বললাম, আমাদের করোনা পরীক্ষা করা দরকার, মেডিকেল টিম কখন প্রস্তুত? বাবা-মাকে নিয়ে আমরা দুঃশ্চিন্তায়।’ফারুকির মা আফসারি বানুর বয়স ৫৫ বছর। তিনি ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও উচ্চরক্তচাপে ভুগছেন। আর বয়সের কারণে তার ৬৪ বছর বয়সী বাবা আনসার আহমেদ এমনিতেই ঝুঁকিতে।‘কোয়ারেন্টিন ওয়ার্ডে আমাদের কতদিন থাকতে হবে, তা জানা ছিল না। মায়ের জন্য যথেষ্ট ঔষধ নিয়ে আসতে পারিনি।ফারুকি বলেন, মায়ের ঔষধের ব্যবস্থাপত্র আমার হাতে ছিল। ১১ এপ্রিল তারা আমাদের সকালে নাস্তা দেন। আমি তাদের প্রয়োজনীয় ঔষধের নাম জানালাম। বললাম যে মায়ের জন্য এই ঔষধগুলো লাগবে।কর্মকর্তারা সেই ঔষধগুলো আনার ব্যবস্থা করলেন না। বললেন, স্টোরে এসব নেই।‘পরের দিন ছিল রোববার। আমাদের বলা হল, ফার্মেসি বন্ধ। সোমবার এক চিকিৎসক আমাদের পরিদর্শনে এলেন। মঙ্গলবার ঔষধ পাবো বলে তিনি আশ্বাস দিয়ে গেলেন।’ততক্ষণে আফসারি বানুর রক্তচাপ বেড়ে যায়। তিনি অসুস্থবোধ করেন। হাঁটাচলাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।ফারুকি বলেন, আমরা একটি হুইলচেয়ার চেয়ে অনুরোধ করলাম। তারা দুমিনিটের জন্য একটি হুইলচেয়ার দিলেন। আমরা যে সেটি পেয়েছি, ক্যামেরার সামনে তা বলতে হয়েছে। কিন্তু ময়ের জন্য ঔষধ আর পেলাম না।ওই ভিডিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। ক্যামেরাবন্দি হওয়ার পরেই আমাদের কাছ থেকে হুইলচেয়ার কেড়ে নেয়। আধঘণ্টার মধ্যে নতুন একটি চেয়ার দেয়ার আশ্বাস দিলেও তা আর পাওয়া হয়নি।ইতোমধ্যে বাথরুমে গিয়ে পড়ে যান আফসারি। তিনি খুব ধীর পায়ে হেঁটে বাথরুমে গিয়েছিলেন। এরপর শরীর ঘামতে শুরু করে। তার নাক দিয়ে তরল পদার্থ বেরিয়ে আসে।ফারুকি বললেন, একটি অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে আমরা চিৎকার দিলাম। কিন্তু ওয়ার্ড চিকিৎসক কিছুই করলেন না। পরে একটি ক্যাবে চড়ে হাসপাতালে যাই মাকে নিয়ে।কোয়ারেন্টিন কেন্দ্র থেকে হাসপাতাল ছিল তিন কিলোমিটার দূরে। লকডাউনের কারণে রাস্তা খালি। হাসপাতালে যেতে খুব সময় লাগেনি। কিন্তু তাও অনেক দেরি হয়ে গেছে।হাসপাতালে পৌঁছা মাত্র চিকিৎসকেরা মাকে মৃত ঘোষণা করেন,’ বললেন ফারুকি। ‘আমরা মাকে হারালাম, তবে সেটা কোভিড-১৯ মহামারীতে না, পুলিশ ও চিকিৎসা কর্মকর্তাদের অবহেলায়।স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বিরেন্দ্র মুহিত বলেন, আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। এটা খুবই গুরুতর অভিযোগ। সমস্যাটা কোথায় ছিল, তা খুঁজে দেখছি।হাসপাতাল থেকে আফসারি বানুর মরদেহ ছাড়া পাওয়ার পর স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। ফারুকি বলেন, মাকে দাফনের জন্য পুলিশের অনুমোদন পেলাম।‘দাফন শেষে পুলিশ তাদের গাড়িতে আমাদের চড়তে দেয়নি। এক আত্মীয়ের মোটরবাইকে একেক করে সবাইকে কোয়ারেন্টিন ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাদের পরীক্ষার ফল না আসলেও করোনা রোগী হিসেবে আমাদের সঙ্গে আচরণ করা হয়েছে।বুধবার সন্ধ্যায় তারা বাড়িতে ফেরেন। কিন্তু করোনাভাইরাস পরীক্ষার ফলও আর পাওয়া হল না।

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



Comments are closed.

সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



সম্পাদক ও প্রকাশক : ডাঃ আওরঙ্গজেব কামাল
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : ইজ্ঞি: মোঃ হোসেন ভূইয়া।
বার্তা সম্পাদক : জহিরুল ইসলাম লিটন
যুগ্ন-সম্পাদক : শামীম আহম্মেদ

ঢাকা অফিস : জীবন বীমা টাওয়ার,১০ দিলকুশা বানিজ্যিক (১০ তলা) এলাকা,ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ ০১৭১৬-১৮৪৪১১,০১৯৪৪২৩৮৭৩৮

E-mail:dnanewsbd@gmail.com

ওয়েবসাইট নির্মানে: আইটি হাউজ বাংলাদেশ