কক্সবাজার শহরে অর্ধশত স্পটে এনজিও’র ঋণে মাদক ব্যবসা!

প্রকাশিত: ০২-০৩-২০১৭, সময়: ০৫:১৬ |
Share This

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন

কক্সবাজার শহরের মাদকের পল্লী হিসেবে পরিচিত বড়বাজার, পশ্চিম রাখাইন পাড়া সহ আশপাশ এলাকার অর্ধশত মাদক ব্যবসায়ী অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। এনজিও সংস্থা থেকে নেওয়া ঋণের টাকায় চলছে বেশীর ভাগ মাদক ব্যবসা। মাদক স্পটে গোয়েন্দা নজরদারী না থাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ সহ প্রশাসনের কতিপয় দুর্নীতিবাজ সদস্য তালিকা করে মাদকের হাট থেকে টাকা উত্তোলণ করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এতে করে মাদক বিক্রেতাদের  দমনে আইনশৃংঙ্খলা বাহিনী পরাস্থ হয়ে গেছে। প্রশাসনের কয়েকজনের সাথে এসব মাদক ব্যবসায়ীদের নগদ চাঁদার চুক্তি, অনৈতিক সম্পর্ক, ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় কয়েকজন নেতার ছত্রছায়া ভয়ানক এ অবৈধ ব্যবসা অপতিরোধ্য ভাবে চলছে বলে সচেতন মহলের অভিমত।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পর্যটন শহরে ভয়াবহ মাদকের এ ব্যবসায় কয়েকটি এনজিও এবং কুরিয়ার সাভির্সের কিছু কর্মীরও সম্পৃক্ততা রয়েছে। এসব প্রতিষ্টান মাদক ভেন্ডারদের ঋন দিয়েও নিরাপদ পরিবহণে সহযোগীতা দিচ্ছে। আর্থিক ,আইনী , প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাদক সিন্ডিকেট এ ব্যবসায় ওপেন সিক্রেটে চালাচ্ছে। এখন নিজেদের স্পটে বিকিকিনির বাইরে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া , সাতকানিয়া, চকরিয়া ও শহরের নানা স্থানে হেরোইন, ইয়াবা পৌঁছে দিচ্ছে কয়েকটি চক্র। শহরের বড়বাজার রাখাইন এ পাড়াটিতে কয়েকটি পরিবার ছাড়াও বাকীদের সকলেই মাদক ব্যবসা নির্ভর।

আরো জানা যায়, পূর্বে এসব পরিবার বাংলা মদের সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। অতি স্বল্প সময়ে আর্থিত স্বচ্ছলতার মোড় ঘোরাতে গিয়ে তারা ধরেছে হেরোইন ও ইয়াবা সহ ভয়াবহ সব ব্যবসায়। তবে দীর্ঘ যাত্রায় এ ব্যবসায় কয়েক দফা জেল খেটেছে হেরোইন ভেন্ডার স্বামী-স্ত্রী সহ মাদক ব্যবসায়ী চক্রের অন্তত শতাধিক সদস্য। এমনকি এসবের বিরুদ্ধে রয়েছে মাদক আইনে সর্বোচ্চ ১০টি থেকে সর্বনি¤েœ ৩/৪টি করে মামলা। কারো কারো রয়েছে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মচারীদের উপর হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার গ্রেফতারি পরোয়ানাও। র‌্যাব ও পুলিশ সহ বিভিন্ন সংস্থা ঝটিকা অভিযান চালিয়ে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিলসহ মাদক ব্যবসায়িদেও গ্রেফতার করেন। বেশ কিছুদিন কারাভোগের পর জামিনে বেরিয়ে এসে শুরু করে পুরনো ব্যবসা। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে ভাটার কারণে থেমে নেই তাদের মাদক ব্যবসা।

খোঁজ নিয়ে আরেআ জানা গেছে, কক্সবাজার মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা মাদক স্পট থেকে নগদ চাঁদা নিয়ে মাদক ব্যবসায়ী চক্রকে মামলায় আইনি ফাঁক ফোঁকর ফাঁস করে দিচ্ছে। এ কারণেই চিহ্নিত মাদক চক্র তাদের অবৈধ ব্যবসার বিস্তৃতি দ্রুত করতে পারছে বলে ধারণা প্রতিবেশীদের।

বড় বাজার (রাখাইপাড়া) এলাকাবাসি জানায়, শতাধিক মাদক ব্যবসায়ী  চক্রের হয়ে আরো শতাধিক নারী, পুরুষ ও শিশু খুচরা বিক্রেতা কাজ করে শহর, শহরতলি ও হোটেল মোটেল জোন এলাকায়। এরা মাদক ভেন্ডারের কাছ থেকেই বিক্রির উপর কমিশনের টাকা পায় ।

সুত্র জানায়, এ পাড়ার হেরোইন ভেন্ডার আবু রাখাইন, মিনু মার্মা দম্পত্তির হয় শহরে হেরোইন বিক্রি করে পেশকার পাড়ার মিন্টু, সাদ্দাম, গুরাইয়া, উবা রাখাইন, দোকানদার ইকবাল, বার্মাইয়া শুক্কুর সহ আরো ৫ যুবক। তবে সাম্প্রতিক সময়ে শুধু বার্মাইয়া শুক্কুর নয় মাদকে ভেন্ডার আবু-মিনু দম্পত্তি কাজের মেয়ে খুরুস্কুলের রূপসী মিনুর ছেলে উসাচি, আবুর প্রথম স্ত্রীর ছেলে জয়, খালাত ভাই ময়ূককে দিয়েও শহরের অন্য স্পুটে গুলোতে হেরোইন সরবরাহ করে থাকে। এ দম্পত্তির পাইকারী ক্রেতাদের একট তালিকারও সন্ধান মিলেছে। তবে তাদের প্রায়ই চট্টগ্রামের কয়েকটি উপজেলার খুচরা বিক্রেতা। মদের মধ্যে লোহাগাড়ার মন্নান, নুরুল কবির ড্রাইভার, বটতলি আমিরাদের শহীদ, চকরিয়ায়ার বাট্টি কালো, রিপন উল্লেখযোগ্য।

কক্সবাজার পর্যটন শহরের পাহাড়তলি জাদি পাহাড়ের কাসেম, ঘোনার পাড়ার বাসন্তি,নুনিয়ারছড়া টুইট্টা পাড়ার হেরোইন লালু, ফুলছড়ি বামন কাটার নাছির, টেকনাফ পালংখালীর জুনু ড্রাইভার, মহেশখালীর নুর হোছন প্রতি সপ্তাহে  একবার এসে এ দম্পত্তির কাছ থেকে পাইকারী দামে হেরোইন ক্রয় করেন। এ দম্পত্তি মাদক ব্যবসায় নানান কৌশলও বেচে নিয়েছে। তাদের বাড়ী নামের মাদক আখড়ায় আবু তার খালাকে  দিয়ে শহরের হেরোইন সেবীদের কাছে খুচরা বিক্রি করায় এবং স্ত্রী মাদক রাণী মিনু মার্মা সালাম মার্কেটে সংলগ্ন পাটি গলিতে বসে খুচরা ও পাইকারী দরে হেরোইনের পুরিয়া সরবরাহ দেয়। আর স্বামী হেরোইন ভেন্ডার আবু রাখাইন তার সহযোগী সাবেক বিডিআর কমান্ডার পাগলা নেজাম সহ আরো কয়েকজন জেলার বাইরে পাইকারী হেরোইন পৌঁছে দিচ্ছে।

জানা গেছে, এই দম্পত্তি শহরের দক্ষিণ বাহারছড়াস্থ কোস্ট, আল ইনসাফ, প্রভাতী, ব্র্যাক সহ আরো বিভিন্ন নামের এনজিও থেকে প্রতিমাসে লাখ লাখ টাকা ঋন নেয়। সেই টাকার হলিডে মোড়স্থ একটি কুরিয়ার সাভির্সের মাধ্যমে চট্টগ্রাম পাঠানো হয়। পরে আবু রাখাইন হেরোইনের চালান নিয়ে আসে। পরে কক্সবাজার শহরস্থ হেরোইন আখড়ায় হেরোইন সরবরাহ দেয়। মাদক ব্যবসায়িরা কঠোর গোপনীয়তায় হেরোইনের পুরিয়া বেঁধে খুচরা বিক্রি করে যাচ্ছে। এ কাজে মিনুর মামাও সহযোগীতা দেয়। মইয়ুর স্ত্রী মীমাসে ও খালাত বোন এ্যামাছেন সহ অন্যান্য দম্পত্তিরা এভাবেই চালাছে হেরোইন ব্যবসা।

মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত এমন কিছু ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কক্সবাজার থানা, শহর ফাঁড়ি, ডিবি,এসবি, মাদকদ্রব্য নিয়স্ত্রণ অধিদপ্তর, বিভিন্ন সংস্থা সোর্স সহ বিভিন্ন লোকজনকে প্রতি সপ্তাহে দিতে হচ্ছে চাঁদা। টাকা দিতে বিলম্ব হলেই চলে অভিযান ও গ্রেফতারের মতো কাজ।

দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা মাদক ব্যবস্থা বন্ধ হচ্ছে না কেন? এসব প্রশ্নের উত্তরে স্থানীয় পেশকারপাড়ার ক্ষমতাসীন দলের এক কর্মী জানান, একেক জন মাদক বিক্রেতা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিভিন্ন স্তরে প্রতিমাসে লাখ টাকা চাঁদা দেয়।  তাই বলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ ও যুব সমাজ। অবনতি ঘটছে আইনশৃংঙ্খলার

ওই ওয়ার্ডের বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক যুবলীগ নেতা বলেন, মাদক ব্যবসায়ী হলেও তারা প্রতিবেশী মানুষ। তাদের আপদে বিপদে সাহায্য না করে পারিনা।

তবে তিনি বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কড়া নজরদারী থাকলে শহরের এই অর্ধশত স্পটে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রন হতো। চিহ্নি মাদক ব্যবসায়ী চক্রের গতিবিধি নজরে নিলে সপ্তাহে ২/১ জন মাদক সহ হাতে নাতে গ্রেফতার সম্ভব বলে জানান তিনি।

Leave a comment

ফেসবুকে আমরা

সর্বশেষ সংবাদ

উপরে