করোনাভাইরাসের থাবা শিলা কাঁকড়ায়,রপ্তানী কমেছে ৭০ ভাগ

বাগেরহাট প্রতিনিধি : চীনে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে সুন্দরবন সন্নিহিত ৫টি জেলার হাজার- হাজার খামারে চাষ হওয়া শিলা কাঁকড়া রপ্তানীতে ধ্বস নেমেছে। উৎপাদিত এসব শিলা কাঁকড়ার ৭০ ভাগই রপ্তানী হতো চীনে। করোনাভাইরাসের কারনে ২৩ জানুয়ারী থেকে চীনে শিলা কাঁকড়া রপ্তানী সম্পূর্ন বন্ধ রয়েছে। একদিকে প্রধান আমদানীকারক দেশ চীনে শিলা কাঁকড়া রপ্তানী সম্পূর্ন বন্ধ থাকায় ও শীতকালের শেষে দক্ষিনাঞ্চলের নদ-নদীর পানিতে লবণাক্ততার পরিমান ৫ পিপিটি’র নিচে নেমে যাওয়ায় খামারে উৎপাদিত কাঁকড়া মরতে শুরু করেছে। কেজিপ্রতি ৩ হাজার টাকা শিলা কাঁকড়া বর্তমানে ৬ থেকে ৮ শত টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই অবস্থায় কাঁকড়া খামারীরা চরম আর্থিক মুখে পড়েছেন।
মৎস্য বিভাগের হিসেবে গত অর্থবছরে বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, বরগুনাসহ সুন্দরবন সন্নিহিত ৫টি জেলা ছাড়াও কক্সবাজার – চট্টগ্রাম অঞ্চলের ৯ হাজার ৮৫৪ হেক্টর জমিতে ১১ হাজার ৭৮৭ মেট্রিক টন রপ্তানীপন্য কাঁকড়া ও কুঁচে উৎপাদিত হয়। এরমধ্যে বাগেরহাটসহ সুন্দরবন সন্নিহিত ৫টি জেলায় উৎপাদিত বিশ^খ্যাত শিলা কাঁকড়ার ৭০ ভাগই রপ্তানী হয়ে থাকে চীনে। এরমধ্যে গতঅর্থ বছরে ১১ হাজার ৪৩৫ মেট্রিক টন কাঁকড়া ও কঁচে রপ্তানী করে দেশ আয় করে ২১৭. ৫৩ কোটি টাকা।
বাগেরহাট সদরের বিষ্ণপুর গ্রামের সোহবার হোসেন, মোংলার কানাইমারী গ্রামে অনিল মন্ডল ও রামপালের পেড়িখালী গ্রামের শিলা কাঁকড়া খামারী কবির হোসেন জানান, তারা এক-একজন থেকে এক থেকে ২ হেক্টর জমির খামারে রপ্তানীপন্য শিলা কাঁকড়া চাষ করে এবার বিপাকে পড়েছেন। চীনে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর ২৩ জানুয়ারী থেকে চীন শিলা কাঁকড়া আমদানী সম্পূর্ন বন্ধ করে দিয়েছে। খামারগুলোতে কাঁকড়া পূর্ন বয়স্ক হলেও একদিকে চীনে শিলা কাঁকড়া রপ্তানী সম্পূর্ন বন্ধ ও শীতকালের শেষে দক্ষিনাঞ্চলের নদ-নদীর পানিতে লবণাক্ততার পরিমান ৫ পিপিটি’র নিচে নেমে যাওয়ায় খামারে উৎপাদিত কাঁকড়া মরতে শুরু করেছে। ১৯ ও ২০ জানুয়ারীর বড় সাইজের এক কেজি শিলা কাঁকড়া তারা ৩ হাজার টাকায় ডিপো মালিকদের কাছে বিক্রি করলেও এখন তা বর্তমানে ৬ থেকে ৮ শত টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শিলা কাঁকড়া উৎপাদন ভালো হলেও করোনাভাইরাসের কারনে চীনে রপ্তানী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব খামারীদের মতো হাজার-হাজার কাঁকড়া চাষি চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এই অবস্থায় ব্যাংক ও এনজিও থেকে লোন নিয়ে কাঁকড়া চাষ করা চাষিরা সর্বশান্ত হবার উপক্রম হয়েছে।
রামপালের কাঁকড়া ডিপো মালিক আ. রাজ্জাক জানান, বাগেরহাট জেলার চাষিদের খামারগুলোতে উৎপাদিত শিলা কাঁকড়ার ৭০ ভাগই রপ্তানী হয়ে থাকে চীনে। করোনাভাইরাসের কারনে গত ২৩ জানুয়ারী থেকে চীনে শিলা কাঁকড়া রপ্তানী বন্ধ থাকায় তারা আর কাঁকড়া বেচাকেনা প্রায় বন্ধ হয়েগেছে। চীনে রপ্তানী বন্ধের আগে কেনা ৩ হাজার টাকায় কেজি প্রতি কেনা কাঁকড়া নিয়ে এখন আমরা উৎকন্ঠায় রয়েছি। খামার থেকে তোলার পর কাঁকড়া ২৫ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকে। পানিতে লবনাক্ততার পরিমানা কমে যাওয়ায় একদিকে চাষিদেও খামারে যেমন পূর্ন বয়স্ক কাঁকড়া মারা যাচ্ছে, অন্যদিকে আগে কেনা শিলা কাঁকড়া এখন আমাদের ডিপোতেই মারা যাচ্ছে। এই অবস্থায় খামারীদের পাশাপাশি আমরা ডিপো মালিকরাও চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি। এখন বড় সাইজের কাঁকড়ার দাম জেজিপ্রতি ৬শত থেতে ৮ শত টাকায় নেমে এলেও আরো ক্ষতির আশংকায় কোন ডিপো মালিক আর্থিক ঝঁকি নিয়ে সে দামেও কাঁকড়া কিনছেনা।
চীনে শিলা কাঁকড়া রপ্তানীকারক ও বাগেরহাট শহররক্ষা বাঁধ এলাকার কাঁকড়া ব্যবসায়ী সাধন কুমার সাহা জানান, বাগেরহাট জেলার চাষিদের খামারগুলোতে উৎপাদিত শিলা কাঁকড়ার ৭০ ভাগই রপ্তানী হয়ে থাকে চীনে। আর দেশের মোট কাঁকড়া রপ্তানীর ৩০ ভাগই হয়ে থাকে বাগেরহাট জেলা থেকে। আমি সর্বশেষ গত ২২ জানুয়ারী চীনে শিলা কাঁকড়া রপ্তানী করেছি। করোনাভাইরাসের কারনে এখন চীন আর কাঁকড়া আমদানী করছেনা। চীনের আমদানীকাররা আমাদের জানিয়েছে সেখানে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে তারা আর কাঁকড়া আমদানী করবেনা। ১৫ ডিসেম্বর থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত চীনে শিলা কাঁকড়া রপ্তানীর ভরা মৌসুম। এই ভরা মৌসুমে চীন শিলা কাঁকড়া আমদানী বন্ধ করে দেয়ায় বাগেরহাটসহ সুন্দরবন সন্নিহিত এলাকার কাঁকড়া চাষিদের পাশাপাশি আমরা রপাতানীকারকরাও চরম আর্থিক ভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছি। আগে কেনা শিলা কাঁকড়া এখন আমাদের ডিপোতেই মারা যাচ্ছে। চীনে করোনাভাইরাসের থাবা দেশের রপ্তানী বানিজ্যেও পড়েছে।
বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. খালেদ কনক জানান. বাগেরহাটের ৭টি উপজেলায় প্রায় দেড় হ্জার হেক্টর জমিতে চাষিদের ৩ হাজার ৭৭৮টি খামারে সনাতন ও অধুনিক বক্স পদ্ধতিতে শিলা কাঁকড়া ও কুঁচে চাষ হয়েছে। অধিক ভাবে লাভজনক হওয়ায় বাগেরহাট জেলায় প্রতিবছর শিলা কাঁকড়া ও কুঁচে চাষের জমি ও খামারের সংখ্যা বাড়ছে। গত অর্থ বছরে বাগেরহাটের খামারীরা ২ হাজার ৬২৯ মেট্রিক টন শিলা কাঁকড়া উৎপাদন করে। এবছর উৎপাদন ভালো হয়েছিলো। ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত চীনে শিলা কাঁকড়া রপ্তানীর ভরা মৌসুম। এই সময়ে খামারগুলোতে পূর্ন বয়স্ক পেটে ঘিলু ভরা শিলা কাঁকড়া পাওয়া যায়। এই জেলায় উৎপাদিত শিলা কাঁকড়ার ৭০ ভাগই রপ্তানী হয়ে থাকে চীনে। আর দেশের মোট কাঁকড়া রপ্তানীর ৩০ ভাগই হয়ে থাকে বাগেরহাট জেলা থেকে। করোনাভাইরাসের কারনে চীনে শিলা কাঁকড়া রপ্তানী সম্পূর্ন বন্ধ রয়েছে। এই অবস্থায় খামারীদের ক্ষতি কিছুটা হলেও কমাতে জেলা মৎস্য বিভাগ সরেজমিনে চাষিদের খামাগুলো পরির্দশন করে পানিতে লবণাক্ততার পরিমান ৫ পিপিটি’র উপারে রাখতে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। যাতে করে পূর্ন বয়স্ক কাঁকড়া মারা না যায়।

Comments

comments

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



Comments are closed.

সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



সম্পাদক ও প্রকাশক : ডাঃ আওরঙ্গজেব কামাল
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : ইজ্ঞি: মোঃ হোসেন ভূইয়া।
বার্তা সম্পাদক : জহিরুল ইসলাম লিটন
যুগ্ন-সম্পাদক : শামীম আহম্মেদ

ঢাকা অফিস : জীবন বীমা টাওয়ার,১০ দিলকুশা বানিজ্যিক (১০ তলা) এলাকা,ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ ০১৭১৬-১৮৪৪১১,০১৯৪৪২৩৮৭৩৮

E-mail:dnanewsbd@gmail.com

ওয়েবসাইট নির্মানে: আইটি হাউজ বাংলাদেশ