করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে বিশ্বের ৬০ ভাগ মানুষ!

আওরঙ্গজেব কামাল : করোনাভাইরাস এখন আর শুধু চীনের সমস্যা নয়। এখন এই করোনাভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত গোটা বিশ্ব। করোনাভাইরাসের আতঙ্কে এ বার থমথম করছে চিনের রাজধানী বেজিং, বা প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র সাংহাইয়ের মতো শহরগুলি।এখনও পর্যন্ত ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত এই ভাইরাসে।শুধু হুবেই প্রদেশেই শনিবার আরও ৮১ জনের মৃত্যুর ফলে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৮০। চিনের মূল ভূখণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ৮১৩ জন।তবে করোনায় লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। বর্তমানে করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিল যেন থামছে না।সোমবার শুধুমাত্র হুবেই প্রদেশেই ১০৩ জন মারা গেছে। যেটা একদিনে এত মানুষ মারা যাওয়ার একটা রেকর্ড।দেশটিতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার সংখ্যা এখন ১০১৬জন।তবে রবিবারের তুলনায় নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা ২০ শতাংশ কমেছে। সংখ্যায় সেটা আগে ছিল ৩০৬২ জন এখন ২৪৭৮ জন। হুবেই প্রদেশের স্বাস্থ্য কমিশন সুত্রে জানাগেছে শুধু সোমবার ২০৯৭ জন নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে যেটা আগের দিনের তুলনায় কম। হংকংয়ের একজন জনস্বাস্থ্য বিষয়ক মহামারী বিশেষজ্ঞের অভিমত, করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এটি মহামারী আকারে বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে। নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া নভেল করোনাভাইরাসে বিশ্বের ৬০ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হতে পারেন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন তিনি। লন্ডনে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক গ্যাব্রিয়েল লিং এ মন্তব্য করেছেন। জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞদের এক সম্মেলনে যাওয়ার পথে তিনি সাক্ষাৎকারটি দিয়েছেন। চীন সফর না করেও এই ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।এই পরিস্থিতিতে এমন শঙ্কার কথা জানিয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন হংকংয়ের জনস্বাস্থ্য মহামারী বিষয়ক ওই বিশেষজ্ঞ।এদিকে সোমবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান বলেন, যারা কখনও চীন সফর করেননি, তাদের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ‘টিপ অফ দ্য আইসবার্গ হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধানের এই মন্তব্যের পর হংকংয়ের ওই মহামারি বিশেষজ্ঞ প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের ব্যাপারে সতর্ক করে দিলেন।হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক গ্যাব্রিয়েল লিং। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই আইসবার্গের আকার এবং আকৃতি নিরূপণ করা। বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞই বলছেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রত্যেক ব্যক্তি অন্য প্রায় আড়াই জনের শরীরে এই ভাইরাসের বিস্তার ঘটাতে পারেন। যে কারণে এই সংক্রমণের হার ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ হতে পারে। হংকংয়ের এই অধ্যাপক জানান, বিশ্বজুড়ে এই মহামারির বিস্তার এবং করোনাভাইরাসের প্রতিরোধে চীনের নেয়া পদক্ষেপ ফলপ্রসূ হচ্ছে কি-না সে ব্যাপারে ডব্লিউএইচও’র বিশেষজ্ঞদের বৈঠকে আলোচনা করবেন। তিনি বলেন, যদি চীনের নেয়া পদক্ষেপ কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে; তাহলে চীনের মতো ব্যবস্থা নেয়ার কথা এখনই অন্যান্য দেশের ভাবা উচিত।
বিশ্বে করোনাভাইরাস মহামারির অন্যতম বিশেষজ্ঞ হংকংয়ের এই অধ্যাপক। ২০০২-২০০৩ সালে সার্সের প্রাদুর্ভাবের সময় বিশ্বের অন্যান্য দেশের শীর্ষ বিজ্ঞানীদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন তিনি।গত জানুয়ারিতে ল্যান্সেট মেডিক্যাল জার্নালে লেখা এক নিবন্ধে উহানের পাশাপাশি চীনের অন্যান্য শহরেও নতুন এই করোনাভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছিলেন তিনি। গ্যাব্রিয়েল লিং বলেছেন, এই ভাইরাসের লক্ষণগুলো প্রাথমিকভাবে ধরা না পড়ায় দ্রুত এটি বিশ্বের বড় বড় শহরগুলোতে নিশ্চিতভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এদিকে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানা যাচ্ছে, হুবেই এবং অন্যান্য প্রদেশে শত শত মানুষকে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে, তদন্ত করা হচ্ছে, সতর্ক করা হচ্ছে। কিন্তু নির্দিষ্ট পদ থেকে সরিয়ে নেয়া মানে এই নয় যে তাকে বরখাস্ত করা হবে। এটার আরেকটা অর্থ দাড়ায় তার ‘পদাবনতি’। পদ থেকে সরিয়ে নেয়ার পাশাপাশি কর্মকর্তারা ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে শাস্তি পেতে পারেন।যেমন রেড ক্রসের উপপরিচালক ঝাং কুইন-কে পার্টির পক্ষ থেকে সতর্ক করা এবং প্রশাসনিক মারাত্মক ত্রুটি হিসেবে ধরা হবে।এই মাসের শুরুতে উহান ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকস এর উপপরিচালককে “পার্টির পক্ষ থেকে গুরুতরভাবে সতর্ক করা হয়েছে এবং তার ব্যর্থতাকে মারাত্মক প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, কারণ ফেস মাস্ক সরবরাহ সংক্রান্ত নীতিমালা ভঙ্গ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে”।হুয়াংগ্যাং-এর স্বাস্থ্য কমিশনের প্রধানকেও সরিয়ে নেয়া হয়েছে। হুবেই প্রদেশে উহানের পরে এটিই সবচেয়ে বেশি করোনাভাইরাস আক্রান্ত হওয়া শহর।সম্প্রতি এই সংকট মোকাবেলা করতে না পারার কারণে চীনের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মানুষ ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে।বিশেষ করে একজন চিকিৎসকের মৃত্যুর পর ব্যাপক জনরোষ তৈরি হয় যার সতর্কবার্তা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমে গেলেও চলতি ফেব্রুয়ারিতে তা চূড়ায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে বলে দেশটির শীর্ষ চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন।২০০৩ সালে সার্সের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে চিকিৎসা উপদেষ্টা জং ন্যানসানের ভূমিকা আন্তর্জাতিক খ্যাতি কুড়িয়েছিল।রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি প্রদেশে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে। নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কমে আসছে।তবে রোগ নিয়ন্ত্রণে উহানে যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, সেটাকে অপরিহার্য বলে আখ্যায়িত করেন এই চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ। আর বন্যপ্রাণীর ব্যবসা স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।জং ন্যানসান বলেন, রোগ নিয়ন্ত্রণ কলাকৌশলে আরও উন্নতি করার দরকার চীনের। সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক আগাম সতর্কবার্তার বিষয়ে জোর দিয়েছেন তিনি।সরকারের পদক্ষেপ ও সাম্প্রতিক আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাবলীর ওপর ভিত্তি করে এই পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে বলে তিনি বলেন।করোনাভাইরাসে বিশ্বের ২৪ দেশে ৩১৯ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরে হংকং ও ফিলিপিন্সে কেবল দুজন ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এছাড়া জাপানি বন্দর ইয়োকোহামায় ডায়ামন্ড প্রিন্সেস ক্রুজ শিপের তিন হাজার ৭০০ যাত্রী ও ক্রুদের কোয়ারিন্টিন করে রাখা হয়েছে। সেখানে ৬৫ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।মঙ্গলবার স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, মহামারী বিস্তারের মূলকেন্দ্র হুবেইপ্রদেশে নতুন দুই হাজার ৯৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ১০৩ জন।ডিসেম্বরে উহানের একটি বন্যপ্রাণীর বাজার থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার পর সোমবার একদিনে সবচেয়ে বেশি রোগী মারা গেছেন। কিন্তু আগের তুলনায় আক্রান্ত সংখ্যা ২০ শতাংশ কমেছে বলে খবরে দাবি করা হয়।সাংহাই ফিউডান ইউনিভার্সিটি মেডিকেল স্কুলের ভাইস ডিন উ ফ্যান বলেন, মহামারীর এই সন্ধিক্ষণে সেখানে কিছুটা আশা জেগেছে। কিন্তু অন্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্তের হার ঘিরে এখনও অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুযায়ী করোনাভাইরাস জুনোটিক। অর্থাত্‍ এই ভাইরাস পশুর দেহ থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। তবে সম্প্রতি এই ভাইরাস সিফুড খাওয়ার ফলেই ছড়িয়ে পড়ে বলে মনে করা হচ্ছে। এখন আক্রান্ত মানুষের থেকেও অন্য মানুষের শরীরে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির সংস্পর্শ এলে বা তার সঙ্গে হাত মেলালেও করোনাভাইরাস শরীরে বাসা বাঁধতে পারে।করোনাভাইরাসের আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ হল জ্বর, শ্বাসকষ্ট, কাশি। অসুখ আরও বাড়লে কিডনি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। করোনাভাইরাস মারক ব্যধি। ইতোমধ্যেই এই অসুখে প্রাণ হারিয়েছেন অনেকেই। চিনের উহান শহরেই প্রথম এই ভাইরাস ধরা পড়ে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল এখনও পর্যন্ত করোনাভাইরাসের কোনও ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি। তাই নিজেকে সাবধান রাখাই শ্রেষ্ঠ উপায়। অসুস্থ কারোর কাছাকাছি যাবেন না। বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোবেন। নোংরা হাত চোখে-মুখ দেবেন না।
লেখক ও গভেষক
আওরঙ্গজেব কামাল
মহাসচিব
বাংলাদেশ ন্যঅশনাল নিউজ ক্লাব

Comments

comments

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



Comments are closed.

সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



সম্পাদক ও প্রকাশক : ডাঃ আওরঙ্গজেব কামাল
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : ইজ্ঞি: মোঃ হোসেন ভূইয়া।
বার্তা সম্পাদক : জহিরুল ইসলাম লিটন
যুগ্ন-সম্পাদক : শামীম আহম্মেদ

ঢাকা অফিস : জীবন বীমা টাওয়ার,১০ দিলকুশা বানিজ্যিক (১০ তলা) এলাকা,ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ ০১৭১৬-১৮৪৪১১,০১৯৪৪২৩৮৭৩৮

E-mail:dnanewsbd@gmail.com

ওয়েবসাইট নির্মানে: আইটি হাউজ বাংলাদেশ