নিজের আইনই লঙ্ঘন করছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন

প্রকাশিত: ০১-০৩-২০১৭, সময়: ০৬:১৫ |
Share This

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইনে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম এক অর্থবছরে একবারের বেশি বাড়ানোর সুযোগ নেই। যদিও নিজেদের এ আইনই মানছে না জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। চলতি অর্থবছরের মধ্যেই দুই দফায় বাস্তবায়নের ঘোষণায় গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে কমিশন। এর আগে ২০১১-১২ অর্থবছরেও আইন লঙ্ঘন করে দুই ধাপে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছিল বিইআরসি।

দেশে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পেট্রোলিয়াম খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে ২০০৩ সালের ১৩ মার্চ আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা হয় বিইআরসি। ওই আইনেই গ্যাস-বিদ্যুতের ট্যারিফ নির্ধারণের বিষয়ে বলা আছে। আইনের সপ্তম অধ্যায়ের ৫ নম্বর ধারায় বলা আছে, কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ট্যারিফ/মূল্যহার কোনো অর্থবছরে একবারের বেশি পরিবর্তন করা যাবে না, যদি না জ্বালানি মূল্যের পরিবর্তনসহ অন্য কোনোরূপ পরিবর্তন না ঘটে।

আইনের এ নির্দেশনা সত্ত্বেও গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দুই ধাপে গ্যাসের নতুন মূল্যহার ঘোষণা করেছে বিইআরসি। এ মূল্যহার কার্যকর ধরা হয়েছে চলতি অর্থবছরের মধ্যেই। প্রথম ধাপে ১ মার্চ ও দ্বিতীয় ধাপে ১ জুন থেকে নতুন মূল্যহার কার্যকরের ঘোষণা দিয়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বিইআরসি। আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এ আদেশে বিতর্কের মুখে পড়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিতীয় ধাপে আগামী জুন থেকে কার্যকর হতে যাওয়া গ্যাসের বর্ধিত মূল্যহারের ওপর স্থগিতাদেশও দিয়েছেন হাইকোর্ট।

এক অর্থবছরে দুবার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পক্ষে প্রকৌশলী মোবাশ্বের হোসেন গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রিট আবেদনটি দায়ের করেন। আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিইআরসি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়। রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি জেবিএম হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল দ্বিতীয় ধাপের কার্যকারিতার ওপর ছয় মাসের স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে এ গণবিজ্ঞপ্তি কেন অবৈধ নয়, তা জানতে চেয়ে রুলও জারি করেছেন আদালত। জ্বালানি সচিব, বিইআরসির চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্টদের চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

ক্যাবের পক্ষে আদালতে শুনানি করেন আইনজীবী সাইফুল আলম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) মোতাহার হোসেন সাজু। সাইফুল আলম বলেন, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন-২০০৩ অনুযায়ী, অর্থবছরে একবারের বেশি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নেই। অথচ এ দফায় একবারেই দুই ধাপে মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এছাড়া গণশুনানির ৯০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানানোর কথা। সেটাও করা হয়নি। আদালত রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে দ্বিতীয় ধাপে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ওপর ছয় মাসের স্থগিতাদেশ দিয়েছেন।

তবে নতুন ট্যারিফে আইনের লঙ্ঘন হয়নি বলে দাবি করেন বিইআরসির পরিচালক (গ্যাস ও বিদ্যুৎ) একেএম মনোয়ার হোসেন আখন্দ। গতকাল বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আইনের ধারাটি ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে। আমরা একটি আদেশের মাধ্যমে দুই ধাপে মূল্যহার কার্যকরের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যদি এ সময়ের মধ্যে মূল্যহার নিয়ে পৃথক আরেকটি আদেশ দেয়া হতো, সেক্ষেত্রে কমিশন আইনের লঙ্ঘন হতো।

গণশুনানি-পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানানোর সময়সীমা-সংক্রান্ত যে আইন আছে, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাও লঙ্ঘন করেছে বিইআরসি। আইনের সপ্তম অধ্যায়ের ৬ ধারায় বলা হয়েছে, লাইসেন্সি (বিতরণ কোম্পানি) ট্যারিফ পরিবর্তনের প্রস্তাব বিস্তারিত বিবরণসহ কমিশনের কাছে উপস্থাপন করতে পারবে এবং কমিশন আগ্রহী পক্ষকে শুনানি দেয়ার পর ট্যারিফ পরিবর্তনের প্রস্তাবসহ সব তথ্য পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে সিদ্ধান্তসংবলিত বিজ্ঞপ্তি জারি করবে। গত বছরের ৭ থেকে ১৮ আগস্ট পর্যন্ত পৃথক আটদিনে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এর প্রায় ছয় মাস পর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি মূল্যহার ঘোষণা করা হয়।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এর আগে ২০১১-১২ অর্থবছরেও একই আদেশে দুই ধাপে বিদ্যুতের মূল্যহার বাড়িয়েছিল বিইআরসি। ২০১১ সালের ২২ ডিসেম্বর জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে প্রথম দফায় ১ ডিসেম্বর ও দ্বিতীয় দফায় ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বর্ধিত মূল্য কার্যকর করা হয়। দুই দফায় ২০ দশমিক ৬৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল বিদ্যুতের দাম। তখন এ বিষয়ে কোনো প্রতিবাদ বা আপত্তি না ওঠায় তা কার্যকর হয়। ওই মূল্যহার অনুযায়ী গ্রাহকের কাছ থেকে বিদ্যুৎ বিলও আদায় করা হয়।

উল্লেখ্য, দুই ধাপে গড়ে ২২ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়িয়ে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি গ্যাসের নতুন মূল্যহার ঘোষণা করে বিইআরসি। প্রথম ধাপে বিদ্যমান মূল্যাহারের ওপর গড়ে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, আজ থেকে যা কার্যকর হচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপে বর্ধিত এ মূল্যের ওপর আরো ৯ দশমিক ৮২ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপের এ বর্ধিত মূল্য কার্যকর হওয়ার কথা আগামী ১ জুন থেকে।বণিকবার্তা

Leave a comment

ফেসবুকে আমরা

সর্বশেষ সংবাদ

উপরে