আশুরা : ত্যাগ ও শিক্ষা

প্রকাশিত: ২০-০৮-২০২১, সময়: ১৩:৩৮ |
Share This

ফিরে এলো আজ সেই মুহাররম মাহিনা,ত্যাগ চাই মার্সিয়া ক্রন্দন চাহিনা” হিজরী সনের প্রথম মাস-মুহাররম। এটি একটি পবিত্র গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ মাস। যা অতি সম্মানিত ও বরকতময় মাস সমুহের একটি। ধর্মীয়,সামাজিক ও ঐতিহ্যগত কারণে এর গুরুত্ব অপরিসীম। মুসলিম মিল্লাতের জন্য এ মাসকে বরকত ও পুণ্যময় বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বহু ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি বিজড়িত মুহাররমের দশম দিবস। আরবী ও ইসলামের ইতিহাসে এ দিনকে “ইয়াওমে আশুরা” বা আশুরা দিবস হিসেবে নামকরণ করা হয়েছে। পৃথিবীর বহু ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ও যুগীয় নিদর্শনী ওয়াকিয়া সমুহের আঁকর এই আশুরা। ইসলাম আগমনের পুর্বে ও পরে এ মাসটি অত্যন্ত সম্মানিত ও মর্যাদশীল হিসেবে পরিগণিত। বর্বরতার যুগেও আরবের মুর্খরা এ মাসটিকে সবিশেষ গুরুত্ব দিত। ফলতঃ তারা এ মাসকে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ বিবেচনা করে, অন্যায়, অবিচার,জুলুম,অত্যাচার,ঝগড়া-বিবাদ,দাঙ্গা-হাঙ্গামা,হানা-হানি,যুদ্ধ বিগ্রহ এড়িয়ে চলতো। ১০ মুহাররম আশুরায় মানব জাতির ইতিহাসে যেসব গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা সংঘঠিত হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলোঃ এ দিনেই অভ্যুদয় ঘটে এ ধরিত্রীর। আবার এ দিনেই মহাপ্রলয়ের মধ্যে দিয়ে পৃথিবী লয়প্রাপ্ত হবে। পবিত্র লওহে মাহফুজে আল্লাহ তা’য়ালা যাবতীয় সৃষ্ট জীবের রুহ পয়দা করেছেন। এ দিনেই বহু পয়গম্বর জন্মগ্রহণ করেছেন। এদিনেই বহু পয়গম্বরের দোয়া আল্লাহ তা’য়ালা কবুল করেছেন। মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম আঃ কে এ দিনে সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং এ দিনে তাঁর দোয়া কবুল হয়েছিল। এ দিনে তাকে বেহেস্তে প্রবেশ করান হয়েছিল। হযরত নুহ আঃ মহা প্লাবণ থেকে এ দিনে মুক্তিপান। ইদরীস আঃ বেহেস্তে হতে এ দিনে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং নিজ গোনাহের জন্য কান্নাকাটি করার পর আল্লাহর কুদরতে আবার বেহেস্তে প্রবেশ করান। হযরত ইউনুচ আঃ মাছের পেট থেকে মুক্তিপান,এবং হযরত আয়ূব আঃ কঠিন রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করেন এ দিনে। আল্লাহ তা’য়ালা হযরত ইব্রাহিম আঃ কে সৃষ্টি করেন এবং পাপিষ্ট নমরুদের অনলকুন্ড হতে নি®কৃতি দেন এ দিনে। হযরত মুসা আঃ তুর পর্বতে আল্লাহ তা’য়ালার সাথে কথা বলেন এবং তাওরাত কিতাব লাভ করেন আশুরার দিনে। এ দিনে হযরত ইয়াকুব আঃ বহু শোক-তাপ করার পর প্রিয় পুত্র ইউছুফ আঃ কে ফিরে পেয়েছিলেন। হযরত ঈসা আঃ কে আসমানে উঠিয়ে নেয়া হয় এ দিনে। হযরত জিব্রাইল আঃ হযরত মুহাম্মদ সাঃ এর নিকট ওহী নিয়ে আসেন প্রথম এদিনে। ইতিহাসের ধারায় পবিত্র আশুরার সাথে সর্বশেষ যে হৃদয় বিদারক ঘটনা সংযোজিত হয়েছে তা-হচ্ছে ঐতিহাসিক কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনা, ইমাম হুসাইন রাঃ সত্য ও ন্যায়ের জন্য স্বপরিবারে শাহাদাত বরনের মত মর্মান্তিক ঘটনা। শুধু মক্কার কুরাইশরা নয়,বরং মদিনার ইয়াহুদিও এ দিনটি বিশেষ ভাবে উদ্যাপন করতো। হাদীসের বর্ণনায় রয়েছে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাঃ মদিনায় হিজরত করে দেখতে পেলেন যে, ইয়াহুদীরা আশুরার দিন রোযা রাখছে। তখন নবী সাঃ তাদের কে জিঞ্জাসা করলেন এই দিনে তোমাদের রোজা রাখার কারণ কি ? তখন তারা বলল,এটি একটি মহান দিবস।
আশুরার উল্লেখিত ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর সহিত যুক্ত হয়েছে এ দিনে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা। ৬১ হিজরী ১০মুহাররম ইরাকস্থ কুফর নগরী থেকে ৬০ কিলোমিটার দুরে ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে সংঘঠিত হয় এক হৃদয় বিদারক ঘটনা। অর্থ,প্রাচুর্য,সম্পদ, ক্ষমতার লোভে নয়, শুধু একটি সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য, অন্যায় কে প্রতিরোধ করার জন্য,রাসুল সাঃ এর আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য দ্বীনে হানিফকে আম্লান ও নিষ্কলুষ রাখার জন্য, মনুষ্যত্ব বিবর্জিত এজিদের বিরাট বাহিনীর সাথে অসম যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে নিজের পরিবার পরিজনসহ শাহাদাতের অমূল্য শরবত পান করে দুনিয়ার ইতিহাসে যে নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে নবী দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন রাঃ অমর হয়ে আছেন। কিয়ামত পর্যন্ত এই আত্মত্যাগ প্রত্যেক মুমিনের অন্তরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার প্রেরণা যুগিয়ে যাবে। ইমাম হুসাইনের আত্মত্যাগ মুমিনের অন্তরকে উজ্জীবিত করে রেখেছে। যখনই ইসলামের উপর কোন আঘাত আসে,তখনই মর্দ্দে মুমিনগণ ঝাঁপিয়ে পড়েন,আঘাতকে প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনে মূল্যবান জীবনকে উৎসর্গ করেন অকাতরে। হযরত ইমাম হুসাইন রাঃ কে কারবালা প্রান্তরে এই অসম যুদ্ধে জীবণ উৎসর্গ করতে হবে, এটি তাঁর অজানা ছিল না। স্বীয় নানা বিশ্ব মানবতার মুক্তির দিশারী দোজাহানের কান্ডারী নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাঃ- এর মুখ থেকে পুর্বেই শুনেছেন। এ ছাড়া নিজেও বহুবার স্বপ্নে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখেছেন। এতদসত্ত্বে শাহাদাত কে অবধারিত জেনেই তিনি কুফার পথে পা বাড়িয়েছিলেন। শাহাদাতের নিকট মৃত্যুকে তিনি অতি তুচ্ছ মনে করতেন। হযরত ইমাম হুসাইন রাঃ যে নিশ্চিতভাবেই কারবালার সম্পূর্ণ ঘটনা জানতেন নিম্নলিখিত কয়েকটি ঘটনাই তার প্রমাণ বহন করে। মদিনার গভর্ণরকে ইয়াযিদ আদেশ দেন যে, ইমাম হুসাইনকে ইয়াযিদের প্রতি বায়য়াত গ্রহণ করাতে। এ সংবাদ পেয়ে হযরত ইমাম হুসাইন রাঃ মদিনা থেকে মক্কায় হিজরত করেন। মক্কায় হিজরতের পর কুফাবাসীদের নিকট থেকে দু’শ মতান্তরে দেড়শতাধিক চিঠি পান। এ সব চিঠিতে তারা ইমাম সাহেবের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেছে মর্মে কুফায় আগমনের আহবান জানায়। কুফাবাসীর শ’শ’ আমন্ত্রণপত্র পেয়ে ২৭ রজব বিদায় নেয়ার পূর্ব রজনীতে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে রাসুলে পাক সাঃ-এর রওজা মোবারক গিয়ে সালাম করতঃ রওজা মোবারক জড়িয়ে ধরে অশ্রুসিক্ত নয়নে,কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন, হে নানাজান! আমি সেই হুসাইন, যার দোলনা আল্লাহ তা’য়ালার ফেরেস্তারা দোলাত, যাকে আনন্দ দিতে বনের হরিণীরা তাদের বাচ্চাদের দিয়ে আসত, সায়্যেদাতুন নেছা হযরত ফাতেমা রাঃ-এর নয়নের মনি, যাকে আপনি স্বীয় স্কন্ধে সোয়ার করাতেন। আল্লাহ যাকে দুনিয়ার কাফেরদের বিরুদ্ধে বাঘ বানিয়ে পাঠিয়েছেন সেই হযরত আলী রাঃ-এর কলিজার টুকরা। যার ললাটে আপনি চুম্বন দিতেন সব সময়। কবর জিয়ারত শেষে ঘরে এসে রাহমাতুললিল আলামিন কে ভাবতে ভাবতে এক সময় তাঁর চোখে তন্দ্রা নেমে আসে, তন্দ্রার মাঝে তিনি স্বপ্নে দেখেন বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাঃ তাঁর নিকট বসে তাঁর মাথা নবীজি সঃ স্বীয় কোলে তুলে নিয়ে বলেছেন, হে আমার আদরের নাতী তুমি অতি শীঘ্রই আমার সাথে মিলিত হতে যাচ্ছ। আমি দেখছি তুমি ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর হয়ে ক্লান্ত শ্রান্ত দেহে আমার নিকট ফিরে আসছো। তোমার এই দেহ কারবালার প্রান্তরে দ্বিখন্ডিত হবে। তোমার হলকুমের রক্তে কারবালার মাটি রঙ্গিন হবে। প্রিয় নাতী! তুমি ছবর এখতিয়ার কর। এ কথা শুনার পর তন্দ্রা কেটে গেল। আবার ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে আম্মাজান খাতুনে জান্নাত ফাতিমাতুজ জোহরা রাঃ-এর রওজা মোবারকে গেলেন। সেখানে গিয়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে আরজ করলেন আম্মাজান! আপনার কলিজার টুকরা হুসাইন কারবালার প্রান্তরে শহীদ হতে যাচ্ছে। আপনার নিকট থেকে বিদায় নিতে এসেছে। এদিন ও ঘরে এসে অশ্রুসিক্ত নয়নে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় শুনতে পেলেন, কে যেন বলছে রে হুসাইন আমি হুসাইনের আম্মাজান, রাহমাতুললিল আলামিন বিশ্বনবীর আদরের দুলালী ফাতেমা তোমার অপেক্ষায় সাগ্রহে অপেক্ষা করছি। হযরত হুসাইন রাঃ কারবালার প্রান্তরে শাহাদাত বরণ করে সায়্যেদাতুশ শোহাদার মর্যাদা লাভ করবেন, এ সংবাদ হযরত জিব্রাইল আঃ তাঁর শৈশবেই হুজুরে পাক সাঃ কে জানিয়ে দিয়ে ছিলেন। (আসহাবে রাসুলের হাকিকত)
হযরত ফাতিমা রাঃ শিশু পুত্র প্রসব করার পর উ¤মূল ফজলের কোলে দিয়েছিলেন। একদিন উ¤মূল ফজল শিশুটিকে রাসুলুল্লাহ সাঃ-এর কোলে তুলে দিলেন। কিছুক্ষণ পর নবী সাঃ এর চক্ষু থেকে অশ্রু গড়িয়ে দাড়ি মোবারক বেয়ে পড়লো। উ¤মূল ফজল জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ ! আমার মাতা-পিতা আপনার প্রতি কোরবান হোক আপনার কি হয়েছে ? বিশ্ব নবীজি বললেন, ‘এই মাত্র জিব্রাইল আঃ এসে আমাকে বলে গেলেন যে ভবিষ্যতে আমার এই নাতীকে কতল করবে। এবং জিব্রাইল ঐ জায়গার লাল মাটি এনেও আমাকে দেখিয়েছে যেখানে তাকে কতল করা হবে’। (সায়্যেদাতুস শোহাদা) এসব ঘটনায় এটায় প্রমানিত হয় যে, ইমাম হুসাইন রাঃ জ্ঞাতসারে পরিবার পরিজন নিয়ে কারবালার প্রান্তরে শাহাদাতের তামান্নায় উপস্থিত হয়েছিলেন। হযরত ইমাম হুসাইন রাঃ শাহাদাত বরণ করে মানব জাতির জন্য রেখে গেছেন এক অনুপম দৃষ্টান্ত ও আদর্শ। বলে গেছেন, জীবনের চেয়ে ইসলাম বড়, আদর্শ বড়। আর এ কারণ্ েতিনি অমর হয়ে আছেন। থাকবেন কিয়ামত পর্যন্ত। জগদ্বাসী স্মরণ করবে শ্রদ্ধাভরে। পক্ষান্তরে এজিদ থাকবে অমানুষ হিসেবে। মানুষ নামের কলংক হিসেবে। হুসাইন রাঃ-এর রওজা মোবারকে অগনিত লোক জিয়ারতের জন্য সর্বক্ষণ ভীড় জমায় । পক্ষান্তরে নরাধম এজিদের কবরের কোন চিহ্ন নেই পৃথিবীতে।
সারা পৃথিবীতে মুসলিম নিধনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। আশুরার শপথে সত্য ও ন্যায়ের জন্য হযরত ইমাম হুসাইন রাঃ এর আপোষহীন ভূমিকায় উজ্জীবনের দীক্ষা গ্রহণের সময় এসেছে। মুসলিম জাতি এখনও সমন্বিত ফিরে না পেলে, সারা বিশ্বে তারা গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ হতে বাধ্য হবে। যেমন হয়েছিল এ উপমহাদেশ উপনিবেশিক বৃটিশ বেনিয়াদের চক্রজালে। মুসলিম বিশ্বের জেগে উঠার এখনি সময় মুসলমানদের হকের পক্ষে বাতিলের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর আহবান জানাচ্ছে পবিত্র আশুরার কারবালা ও ইমাম হুসাইন রাঃ-এর শহীদি রক্ত। আল্লাহ প্রত্যেক মুসলমানকে হকের জন্য, কুরআনের জন্য,ইসলামের জন্য প্রয়োজনে আত্মত্যাগ বা জান-মাল অকাতরে বিলিয়ে দেবার তাওফিক দিন। আমীন!

ফেসবুকে আমরা

সর্বশেষ সংবাদ

উপরে