ক্যাসিনো সাম্রাজ্যে আসলে কি শেষ হবে ?

আওরঙ্গজেব কামাল : জুয়ার আড্ডা বা আসরকে বলা হয় ক্যাসিনো। এটি হচ্ছে বিভিন্ন ধরণের জুয়া খেলার একটি নির্দিষ্ট স্থান। এটি সাধারণত সুবিশাল পরিসরে হয়ে থাকে। ক্যাসিনোর পাশিাপাশি হোটেল, রেস্টুরেন্ট, শপিংমল, আনন্দ ভ্রমণ জাহাজ এবং অন্যান্য পর্যটন আকর্ষণ থাকে৷ কিছু কিছু ক্যাসিনোয় সরাসরি বিনোদন প্রদান যেমন স্ট্যান্ড আপ কমেডি, কনসার্ট, খেলাধুলা ইত্যাদির ব্যবস্থা থাকে।ইতালিতে বিভিন্ন অর্থে ক্যাসিনো শব্দটি ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন পতিতালয় (ক্যাসা চুইসাও বলে যার অর্থ বন্ধ বাড়ি) ও শব্দপূর্ণ পরিবেশ। তারা জুয়ার আসর বোঝাতে ভিন্ন উচ্চারণে ক্যাসিনো বলে।
সব ক্যাসিনোই কিন্তু জুয়ার খেলার কাজে ব্যবহার করা হয় না। ক্যালিফোর্নিয়ার শান্তা কাতালিনা দ্বীপের কাতালিনা ক্যাসিনোতে কখনো জুয়া খেলা হয়নি কারণ যখন এটা নির্মাণ করা হয় সে সময়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় জুয়া খেলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিলো। কোপেনহেগেন ক্যাসিনো একটি থিয়েটার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৮৪৮ সালের আন্দোলনের সময় এখনকার গণজমায়েতের কারণে এটা পরিচিত। এই আন্দোলন ডেনমার্ককে একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে পরিণত করে। ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত এটা ডেনিশ থিয়েটার নামে সুপরিচিত ছিলো। ফিনল্যান্ডের হাংকো ক্যাসিনোতেও কখনো জুয়া খেলা হয়নি। ১৯ শতকের শেষের দিকে এটা স্প্যা রিজোর্ট হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে এটা রেস্তোরাঁ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।জার্মান এবং স্প্যানিশ ভাষায় ক্যাসিনো বা কাসিনো দ্বারা অফিসার মেস বোঝানো হয়। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জুয়ার আসরে চলে ক্যাসিনোর রমরমা ব্যবসা। উড়ানো হয় হাজার হাজার কোটি টাকা। বিশ্বজুড়ে রয়েছে এমন অসংখ্য ক্যাসিনো যেখানে জুয়ার নেশায় মেতে থাকেন জুয়াড়িরা। আমেরিকা, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, চীন, ভারত, নেপালসহ অসংখ্য দেশে গড়ে উঠেছে এই টাকা উড়ানোর আসর। অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি খেলার ছলে মনোরঞ্জনের জন্য এসব ক্যাসিনোতে এসে থাকেন। তবে অনেক দেশ এটার কারনে মানুষের ক্ষতির পরিমান বেশী হওয়ায় বন্ধ করে দিয়েছেন। যতদুর জানাযায় ইতালিতে সর্বপ্রথম ১৬৩৮ সালে ভেনিস শহরে রীডোট্ট নামে এক ক্যাসিনো তৈরি করা হয়েছিলো। ওই সময়কার জ্ঞানী লোকদের পরামর্শে এটি তৈরি করা হয়। আর এর উদ্দেশ্য ছিলো কার্নিভাল সিজনে সচারাচার হওয়া জুয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা। তবে সামাজিক অবক্ষয়ের কথা ভেবে ১৭৭৪ সালে সেই শহরের প্রধান এটিকে বন্ধ করে দেয়। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সর্বপ্রথম ক্যাসিনোর নাম স্যালুন্স। যদিও এটি তৈরি করা হয়েছিল পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য। এখানে তারা জুয়ার সঙ্গে সঙ্গে আড্ডা দেওয়া, ড্রিংকস করার সুযোগ পেত। তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যে এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে স্যান ফ্রান্সিকো, নিউ অরলিন্স, সেন্ট লুইস ও শিকাগোর মত শহরে। যা বিশ শতকের দিকে আমেরিকায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৩১ সালে আমেরিকার নেভাদা রাজ্যে সর্বপ্রথম সরকার অনুমোদিত ক্যাসিনো গড়ে ওঠে। বর্তমানে আটলান্টিক সিটি আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্যাসিনো শহর। বর্তমানে ক্যাসিনোর কথা উঠলে শুরুতেই আসবে সিন সিটি লাসভেগাসের কথা। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জুয়ার আসরটি এখানেই বসে থাকে। তবে লাসভেগাস ছাড়াও বিভিন্ন দেশেও নাম না জানা অনেক জুয়ার আসর রয়েছে। কিন্তু টিভি-সিনেমায় দেখা যায়, লাস ভেগাসের ক্যাসিনোর তুলনায় সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোগুলো অনেক ভদ্র প্রকৃতির। ইদানীং এশিয়ার কয়েকটি দেশ এসব জুয়া খেলায় এগিয়ে। এশিয়ার ক্যাসিনোগুলো চুটিয়ে ব্যবসা করছে। এসব জায়গায় হরহামেশাই চলে জুয়ার বড় বড় দান। এশিয়া মহাদেশের নেপাল, ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এসব জুয়ার আসরে এগিয়ে। বালক থেকে বৃদ্ধ, সব বয়সীদের দেখা মিলে এসব ক্যাসিনোতে। কোটি কোটি টাকা ওড়াতে আর মনোরঞ্জন করতে তারা এখানে আসে।এশীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় জুয়ার আসরগুলো বসে নেপালের কাঠমান্ডুতে। হিমালয়ের দেশটিতে ক্যাসিনোর জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি রয়েছে। এসব জুয়ার আসরে সবচেয়ে বেশি জুয়ায় মাতে ভিনদেশি পর্যটকরা। এখানে রয়েছে নামকরা ছয়টি ক্যাসিনো। নেপাল ক্যাসিনোস, ক্যাসিনো ইন নেপাল, ক্যাসিনো সিয়াংগ্রি, ক্যাসিনো অ্যান্না, ক্যাসিনো এভারেস্ট ও ক্যাসিনো রয়েল এখানকার জনপ্রিয় ক্যাসিনোগুলোর মধ্যে অন্যতম। এসব জুয়ার আসরে মজার খেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে- পোকার (জুজু খেলা), বাক্কারাট (বাজি ধরে তাস খেলা), রুলেট, পন্টুন, ফ্লাশ, বিট, ডিলার, ব্লাকজ্যাক এবং কার্ডস্লট মেশিনের খেলা। যেসবের পিছনে ওড়ানো হয় কোটি কোটি ডলার। ২৪ ঘণ্টা ধরেই চলে এসব জুয়ার আসর। অনেকে এক রাতেই রাজ্যের রাজা বনে যান, আবার অনেকেই হয়ে যান রাস্তার ফকির। এখানকার প্রতিটি ক্যাসিনোতে আগ্রহীরা পরিবার-বন্ধুবান্ধব নিয়ে আসেন। রাতভর জুয়া খেলার পাশাপাশি মদের নেশায় মেতে ওঠেন জুয়াড়িরা। বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ। আর ইসলামে জুয়া সম্পূর্ণ হারাম ও নিষিদ্ধ। তবে জুয়া বাংলাদেশের একটি অতিপরিচিত শব্দ। অলিতে গলিতে চোখ মেলে তাকালেই এর দেখা মিলে। তবে বেশ কয়েক বছর আগে এটা এতোটা খোলামেলা ছিলো না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গুঞ্জন আসে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে আনুষ্ঠানিক ক্যাসিনো-এর খোঁজ পাওয়া যায়। বিষয়টি জানতে পেরে সরকার প্রধান শেখ হাসিনা ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং প্রশাসনিক তৎপরতা চালানোর নির্দেশ দেন।সম্প্রতি র‍্যাব-১ এর অভিযানে রাজধানীর ফকিরাপুলে ইয়ংমেন্স ক্লাব, শাহজাহানপুরের মুক্তিযোদ্ধা চিত্তবিনোদন ক্লাব, ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ও বনানীতে কয়েকটি ক্যাসিনোর সন্ধান পাওয়া যায়। র‍্যাব-১ এর সূত্র মতে, এগুলো পরিচালনা করেন রাজনৈতিক ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন যুবলীগের কিছু নেতা। এ সময়ে বেশ কয়েকজনকে আটকও করা হয়।
র‍্যাবের মতে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫০টিরও বেশি ক্যাসিনো রয়েছে। যেখানে জুয়ার পাশাপাশি নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকে। প্রশাসন এদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন।আসলে ক্যাসিনোতে পরিবেশটা এমনভাবে সাজানো থাকে যে আপনি একবার সেখানে প্রবেশ করলে আপনাকে শুধু টাকা উড়াতেই মন চাইবে। সোজা কথায় বললে, ধনী থেকে ফকির হওয়ার সহজ উপায় হচ্ছে নিয়মিত ক্যাসিনোতে যাওয়া।আপনি চাইলে দুধ অথবা মদ, যেটা ইচ্ছা সেটা খেতে পারেন। কোনটা নিবেন সেটা আপনার বিষয়। জেনে শুনে মদ পান করলে কে কি করবে।রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে ৬০টি ক্যাসিনো রয়েছে। এ ছাড়াও অলি-গলিতে না কি ছোট আকারেও ক্যাসিনো আছে। এসব ক্যাসিনোতে অবৈধ ব্যবসাসহ হাউজি খেলা ও নারী সম্ভোগের ব্যবস্থাও রয়েছে। এগুলো পরিচালনার জন্য নেপাল, থাইল্যান্ডসহ চারটি দেশ থেকে প্রশিক্ষিত নারী আনা হয়েছে। ক্যাসিনোগুলোতে প্রতি রাতেই কোটি টাকার খেলা হয়। এসব নিয়ন্ত্রণ করেন রাজনৈতিক নেতারা। রাত যত বাড়তে থাকে ততই এসব ক্যাসিনো জমে ওঠে। ভিড় করতে থাকেন প্রভাবশালীরা। অনেক সময় তাদের সঙ্গে থাকেন উঠতি কোনো নায়িকা কিংবা মডেল। উন্নত বিশ্ব, পর্যটন সিটি ও মাদকের আখড়ার শহরগুলোর কালচার হচ্ছে ক্যাসিনো। আমাদের যানজটের শহর, ঘন বসতির শহর এবং পরিবেশ ও নাগরিক সুবিধার দিক দিয়ে বসবাসের অযোগ্য শহরে ক্যাসিনো- অবাক করার মতো বিষয় বটে! এগুলো তো উন্নয়নের চিহ্ন নয়, নাকি এর পিছনে রয়েছে অন্য কিছু? যেমন আফ্রিকার অনেক দেশে মানুষের পেটে খাবার নেই, গায়ে জামা নেই, অথচ রাতভর ক্যাসিনো থাকে সরগরম।এই ক্যাসিনোর হাত থেকে দেশ বাসীকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপে ধন্যবাদ দিয়েছেন সর্বসাধারন। সাধারণ মানুষ কোথাও স্বস্তি পাচ্ছে না। কথায় বলে- পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা। এখন কেউ যদি বলে ছত্রিশ ঘা- তাহলে কি বাড়িয়ে বলা হবে? মানুষ যাবে কোথায়? জনগণের যারা প্রতিনিধি তারাও দেখুন জনগণের জন্য কি চমৎকার ব্যবস্থা করে রেখেছেন- টর্চার সেল! মিডিয়া এসব তুলে না আনলে দেশের মানুষ কখনও জানতে পারতো না। ধন্যবাদ মিডিয়াকে। জনগণের জন্য অন্তত কাউকে না কাউকে কাজ করতে হবে। জনগণ বাধ্য হয়েই তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন যাতে তারা দেশটাকে ভালো ভাবে পরিচালিত করেন। কিন্তু তারাই যখন ভক্ষক সেজে বসে থাকে তখন আমাদের কপালের দোষ দেয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না। এসব নেতারাই দিনে হাজারবার বঙ্গবন্ধুর নাম মুখে নিয়ে এসব অপবিত্র কাজ করে যাচ্ছে দিনের পর দিন। এদের রাজনীতিতে কি খুব প্রয়োজন? ভেবে দেখার সময় এসেছে। আশাকরি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ কথাটুকুও বুঝবেন এবং পদক্ষেপ নিবেন। তার এই পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই প্রশংসিত হয়েছে। যে কারণে ধন্যবাদ তিনি পেতেই পারেন।

Comments

comments

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



One response to “ক্যাসিনো সাম্রাজ্যে আসলে কি শেষ হবে ?”

  1. Like!! Really appreciate you sharing this blog post.Really thank you! Keep writing.

Leave a Reply

Your email address will not be published.

সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



সম্পাদক ও প্রকাশক : ডাঃ আওরঙ্গজেব কামাল
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : ইজ্ঞি: মোঃ হোসেন ভূইয়া।
বার্তা সম্পাদক : জহিরুল ইসলাম লিটন
যুগ্ন-সম্পাদক : শামীম আহম্মেদ

ঢাকা অফিস : জীবন বীমা টাওয়ার,১০ দিলকুশা বানিজ্যিক (১০ তলা) এলাকা,ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ ০১৭১৬-১৮৪৪১১,০১৯৪৪২৩৮৭৩৮

E-mail:dnanewsbd@gmail.com

ওয়েবসাইট নির্মানে: আইটি হাউজ বাংলাদেশ