সুন্দরবনের অভ্যন্তরে সংঘবদ্ধ চোরা হরিণ শিকারী চক্র বেপরোয়া

সৈয়দ শওকত হোসেন,বাগেরহাট : বনবিভাগ ও কোষ্টগার্র্ডের জোদার টহল থাকা স্বত্তেও সুন্দরবনের অভ্যন্তরে সংঘবদ্ধ চোরা হরিণ শিকারী চক্র বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এক মাসে ১২২ কেজি হরিণে মাংশ, জাবাইকৃত হরিন, মাথা,চামড়া, শিকারের ফাঁদ ও সরঞ্জমাদি উদ্ধার করেছে বনবিভাগ ও কোষ্টগার্ড। তুলনামুলক আটক হয়নাই এই চোরা শিকারীরা। বন আইনের কঠোর প্রয়োগ না থাকায় যদিও দু,একজন আটক হয় তার আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে আসে। এই বেরিয়ে আসার সুয়োগ পায় বলে বে-পরোয়া চোরা শিকারীরা রশিরফাঁদ, স্প্রীং বসানো ফাঁদ, বিষটোপ, গুলি ছুঁড়ে, কলার মধ্যে বশির্র ফাঁদসহ পাতার ওপর চেতনানাশক ঔষুধ ছিটিয়ে এবং জাল পেতে, অব্যহত হরিণ শিকার করছে। এই চোরেরা হরিণ শিকার করে তা দেশের ভিন্ন স্থানে চড়া দামে বিক্রী করা হচ্ছে বলে জনশ্রুতি ও রয়েছে। বন বিভাগ, কোষ্টগার্ড ও অন্যান্য আইন শৃংখলা বাহিনীর কঠোর নজরদারীর মধ্যেও চোরা শিকারীরা কৌশলে সুন্দরবন থেকে হরিণ শিকার করছে।
গত প্রায় দু’সপ্তাহের ব্যবধানে বন বিভাগ ও কোষ্টগার্ড পৃথক চারটি অভিযান চালিয়ে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা থেকে শিকার করে আনা জবাইকৃত হরিন,৬৩ কেজি হরিণের মাংস, মাথা, চামড়াসহ শিকারীদের ব্যবহত হরিণ শিকারের সরঞ্জামাদি উদ্ধার করেছে। এর আগে গত ২১ থেকে ২৩ নভেম্বর রাস মেলা চলাকালীন সময়ে বন বিভাগ ও আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালিয়ে হরিণের মাংস, হরিণ ধরার ফাঁদ, সরঞ্জাম ও নৌকাসহ ৫৭ জনকে আটক করে।
আটক কৃতদের বন আইনে মামলাও দেওয়া হয়। এ সময় হরিণের মাথা, চামড়াসহ বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করেছে বনবিভাগের সদস্যরা। এ ছাড়া ২২ জনকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। সর্ব শেষ ৩০ জানুয়ারী গভীররাতে চড়াপুটিয়া থেকে ৩৫ কেজি ওজনের একটি জবাইকৃত হরিন ও ফাদঁ উদ্ধার করা হয়। রাস মেলা ও বর্তমান সময়ে ব্যাপকভাবে হরিণ শিকারের ঘটনায় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো উদ্বেগ জানিয়ে প্রশাসন ও বনবিভাগকে আরো কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জয়মনি ও সুন্দরবন ইউনিয়নের একাধিক বনজীবী জানান, রাস মেলায় ব্যাপকহারে হরিণ শিকার হয়েছে সেতুলনায় এখন শিকারের পরিমান কম। তবে একেবারে বন্ধ হয়নি। বিভিন্নভাবে চোরা শিকারীরা হরিণ শিকার করে লোকালয়ে তা বিক্রী করছে। এরপর চামড়া, শিং সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ পাঠিয়ে দেওয়া হয় উপযুক্ত ক্রেতাদের কাছে। কখনো কখনো ঝামেলা এড়াতে তা মাটিতে পুঁতে বা সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। ‘রাজ মাংস’ নামে হরিণের মাংস দেশের বিভিন্ন স্থানে ৭শ’ থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত্য প্রতি কেজি স্থানভেদে বিক্রি করা হয়।
চড়াপুটিয়ার অফিস ইনচার্জ মোঃ ইসমাইল হোসেন জানান,গত ৩০ জানুয়ারী রাতে মরাপশুরের কাগাখালে ভারানী দিয়ে টহলরত অবস্থায় একটি নৌকা, তার একটু উপরে ৩৫ কেজি ওজনের একটি জবাইকৃত হরিন ও ২০০ হাত ফাদঁ উদ্দার করা হয়। এসময় নৌকায় থাকা চাদঁপাই ষ্টেশন থেকে ১৫ জানুয়ারী মোংলা উপজেলার চাদঁপাই ইউনিয়নের হাকিম হাওলাদার’র ছেলে একলাস (৩৫),ইলিয়াস (৩২) ও ইয়াসীন হাওলাদার (২৯) নামে একটি মাছের পাশ উদ্ধার করে। তাদের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে বলে জানান এ কর্মকর্তা। এছাড়া গত ১৯ জানুয়ারি দিনগত রাতে সুন্দরবন থেকে আট কেজি হরিণের মাংসসহ একটি চামড়া ও একটি মাথা উদ্ধার করেছে কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন। মোংলা উপজেলার আমবাড়িয়া খাল সংলগ্ন এলাকা থেকে এগুলো উদ্ধার করা হয়। বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের গোয়েন্দা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট আব্দুল্লাহ আল-মাহমুদ জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার দিনগত রাতে অভিযান চালিয়ে হরিণের মাথা, মাংস ও চামড়া উদ্ধার করা হয়। এসময় পাচারকারীরা পালিয়ে যাওয়ায় তাদের আটক করা যায়নি। পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নিতে উদ্ধার হওয়া হরিণের মাথা, মাংস ও চামড়া জোংরা ফরেস্ট অফিসে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এর আগে ১৭ জানুয়ারী পশ্চিম সুন্দরবনের সাতীরা রেঞ্চের তেরকাটি খাল এলাকা থেকে এলাকা থেকে ২৫ কেজি হরিণের মাংস জব্দ করেছে বন বিভাগ। এ ছাড়া ৭ জানুয়ারী বনবিভাগ মোংলার পশুর নদীর চিলা বাজার সংলগ্ন কানাইনগর এলাকা থেকে একটি ডিঙ্গি নৌকাসহ ৩০ কেজি হরিনের মাংস উদ্ধার করে। অবশ্য এসব ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি বন বিভাগরে উদ্ধারকারী বনরক্ষিরা। রাস মেলা ও পরবর্তী সময়ে বিপুল সংখ্যক হরিণ শিকারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন।
সুন্দরবন নিয়ে গবেষনাকারী বেসরকারী সংগঠন ‘সেভ দ্যা সুন্দরবন’ এর চেয়ারম্যান ফরিদুল ইসলাম বলেন বন বিভাগ ও প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় এবার রাস মেলায় অনেক বেশী হরিণ নিধনের ঘটনা ঘটেছে। এখন একটু কমলেও হরিণ শিকার চলছে। বন বিভাগ ও প্রশাসনকে হরিণ শিকার রোধে আরো বেশী কঠোর হতে হবে। হরিণ শিকার রোধে দৃশ্যত বাইরে থেকে বনবিভাগ কঠোর নজরদারি করছে মনে হলেও হরিণ শিকার কিন্তÍ বন্ধ হয়নি। বন আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি বনসংলগ্ন লোকালয়গুলোতে বিভিন্ন সচেতনতামুলক প্রচারের ও আহ্বান জানান তিনি।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মাহমুদুল হাসান এর সাথে কথা বললে তিনিন বলেন, নানা সীমাবদ্ধতা ও লোকবলসংকটের মধ্যেও হরিণ শিকারিদের অপতৎপরতা রোধ করতে বনবিভাগ সবসময় তৎপর রয়েছে। বনরক্ষীদের পাশাপাশী আমাদের স্মার্ট পেট্রোল দল সব সময় কাজ করছে। যাদেরকে আমরা আটক করে আদালতে প্রেরণ করি তার আইনের ফাকফোকর দিয়ে বের হয়ে যায় তবে তাদেরকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। তাহলে এই জাতীয় অপরাধ সংঘটনের হার বহুলাংশে হ্রাস পাবে। এছাড়া আমরা বিভিন্নভাবে সুন্দরবন সংলগ্ন লোকালয় গুলোতে সচেতনতা মূলক কর্মকান্ড গ্রহন করছি।

 

Comments

comments

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



One response to “সুন্দরবনের অভ্যন্তরে সংঘবদ্ধ চোরা হরিণ শিকারী চক্র বেপরোয়া”

  1. Like!! Really appreciate you sharing this blog post.Really thank you! Keep writing.

Leave a Reply

Your email address will not be published.

সর্বশেষ আপডেট



সর্বাধিক পঠিত



সম্পাদক ও প্রকাশক : ডাঃ আওরঙ্গজেব কামাল
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : ইজ্ঞি: মোঃ হোসেন ভূইয়া।
বার্তা সম্পাদক : জহিরুল ইসলাম লিটন
যুগ্ন-সম্পাদক : শামীম আহম্মেদ

ঢাকা অফিস : জীবন বীমা টাওয়ার,১০ দিলকুশা বানিজ্যিক (১০ তলা) এলাকা,ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ ০১৭১৬-১৮৪৪১১,০১৯৪৪২৩৮৭৩৮

E-mail:dnanewsbd@gmail.com

ওয়েবসাইট নির্মানে: আইটি হাউজ বাংলাদেশ