দেড়শ ভাষা এক শহরে

প্রকাশিত: ২৮-০২-২০১৭, সময়: ১০:০৪ |
খবর > ফিচার
Share This

একটা শহরে বাসিন্দাদের মধ্যে প্রচলিত সর্বোচ্চ কয়টি ভাষা থাকতে পারে? যদি বলা হয় দেড়শ! শুনতে নিশ্চয়ই অস্বাভাবিক লাগবে। তবে এটাই কিন্তু সত্য। হ্যাঁ, পৃথিবীতে এমন শহরও আছে, যেখানে একই সঙ্গে প্রচলিত আছে দেড়শ ভাষা।

শহরটি যুক্তরাজ্যের স্লাউ শহর। এখানে এত বেশি ভাষা প্রচলিত থাকার কারণ- শহরটি মূলত অভিবাসীদের শহর। বিশ শতকের বিশের দশক থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কাজের সন্ধানে তারা ভীড় জমাতে শুরু করে এখানে। এখনকার আবসন ব্যবসাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অভিবাসীদের স্বাগত জানিয়েছ। এতে লাভবান হয়েছে সবাই। শহরের আদিম অধিবাসীরা এবং অভিবাসীরা।

আজকের দিনে অর্থনৈতিকভাবে বিশ্বের সবচে সফল শহর বলা যায় স্লাউকে। এখানকার বেকারত্বের হার ১ দশমিক ৪ শতাংশ। আর সপ্তাহে বাসিন্দাদের আয় গড়ে ৫৫৮ পাউন্ড (প্রায় ৫৫ হাজার টাকা)। তবে এতগুলো দেশ থেকে অভিবাসী আগমন সত্ত্বেও স্লাউয়ের বাসিন্দারা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়নি।

এক দশক আগেও মধ্য এবং পূর্ব ইউরোপ থেকে কয়েক হাজার অভিবাসী পাড়ি জমিয়েছে ব্রিটেনের ওই শহরে। পুরনো বাসিন্দাদের অনেকেই তাদের পছন্দ করে না। স্থানীয় এক নারী বলেন, ‘আপনি যদি কোনো দোকানে যান, কিংসমিলের কোনো রুটি পাবেন না। সব পাবেন পোল্যান্ডের রুটি।’

অন্য একজন জানান, তারা খুবই ক্ষুব্ধ। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘পোলিশদের প্রতি অসম্মানের কারণে নয়, এই ক্ষোভের কারণ তারা (অভিবাসীরা) এখানে আসছে এবং তাদের বাড়িঘরের ব্যবস্থা করে দিতে হচ্ছে।’

ঠিক দশ বছর পরে এসে ইউরোপজুড়ে চলছে অভিবাসন বিতর্ক। আর সেই বিতর্কে সবচে এগিয়ে যুক্তরাজ্য। এই অবস্থায় তাহলে স্লাউ শহরের অবস্থা কী?

শহরের উপকণ্ঠ্যে একটি ওয়ার্কশপে বসে মার্বেল পাথর কাটিং এবং পালিস করছিলেন স্যালভেতর কারুসো ও কর্মীরা। ইতালীয় এক অভিবাসীর ছেলে কারুসো জানান, ১০ বছর আগে পোলিশ কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি এই কাজ শুরু করেন এবং আজো করে যাচ্ছেন।

এসব কাজে অভিবাসী কর্মীদের নিয়োগ না দিয়েও উপায় নেই। তার ভাষায়, ‘আপনি অভিবাসী শ্রমিকদের না নিলে কে আপনার এই কাজ করে দেবে?’ আসলে স্লাউ শহরের অর্থনীতি পুরোটাই অভিবাসী নির্ভর। তারাই এই শহরকে পাল্টে দিয়েছে। তবে পুরনো অবস্থাও আবার বদলে গেছে।

ব্রিটেনের ইউরোপ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছে এই শহরের বাসিন্দারা। বিদেশী শ্রমিকদের দিয়ে ভাগ্য বদল করা এই শহরের অধিবাসীরা চায় যুক্তরাজ্য ইউরোপের বাইরে থাকুক। ১১ বছর আগে পোল্যান্ড থেকে এই শহরে এসেছিলেন সিলভিয়া লেসজিনস্কা। ভবিষ্যতে এখানেই থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি।

স্বামীর সঙ্গে স্লাউতে কিনেছেন একটি বাড়ি। তার বাচ্চারাও ব্রিটিশ স্কুলে পড়াশুনা করছে। তবে যে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলেন সে স্বপ্ন এখন আর দেখেন না সিলভিয়া। তিনি বলেন, ‘এক সময় যেমনটা ভাবতাম, অভিবাসন এখন আর সেরকম ভাল ধারণা না। আমি বরং এখন পোল্যান্ডেই ফিরে যেতে চাই। আমি জানি, তারা আমাদের এখানে চায় না।’

সিলভিয়া আরো বলেন, ‘আমার স্বামী বলে, ফারাজে প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিয়েছে। এখানকার অবস্থা এখন আগের চেয়ে অনেক খারাপ।’

লন্ডনের পরে এত বেশি জাতি গোষ্ঠির মানুষ বাস করে শুধু স্লাউতে। এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে বর্তমানে প্রচলিত আছে দেড়শ ভাষা। সর্বশেষ জরিপ অনুসারে, শহরের বাসিন্দাদের প্রতি পাঁচজনের দুইজনই যুক্তরাজ্যে অভিবাসী হিসেবে এসেছে।

এখন স্লাউর মানুষকে পরিত্যাগ করতে শুরু করেছেন শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশরা। বার্নি এবং অ্যান ডাউনস নিজেদের প্রায় সারা জীবন কাটিয়ে এখন শহর ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা জানান, অনেক কিছুই বদলে গেছে। ডাউনসের ভাষায়, ‘আমি খুবই দুঃখ পাচ্ছি। আমি স্লাউকে ভালোবাসি, এখানকার সব ভালোবাসি। কিন্তু এখন আর কোনো উপায় নেই।’

সূত্র: বিবিসি

Leave a comment

ফেসবুকে আমরা

সর্বশেষ সংবাদ

উপরে