রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় সুচি’কেই নিতে হবে-জাতিসংঘের প্রতিক্রিয়া

প্রকাশিত: ১১-০৩-২০১৭, সময়: ০৭:০৩ |
Share This

মিয়ানমারে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ সংঘটিত হয়েছে বলে আবারও জোর দাবি জানিয়েছে জাতিসংঘ। এই অপরাধের দায় সরকারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সু চি এই অপরাধের দায় এড়াতে পারে না বলে মনে করছে তারা। জাতিসংঘের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে এসব কথা বলেছেন। জাতিসংঘের ওই কর্মকর্তার নাম ইয়াংহি লি।
গত কয়েক মাসে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরেজমিনে দেখে আসার পর এমন মন্তব্য করেন ইয়াংহি লি। উল্লেখ্য, গত বছরের শেষের দিক থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের দমনপীড়নকে মানবতাবিরোধী অপরাধ দাবি করে আসছে সংস্থাটি। রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এবং সেখানকার মুসলিম রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত নির্যাতনের প্রসঙ্গে ইয়াংহি লি বলেন, ‘অবশ্যই এটা মানবতাবিরোধী অপরাধ। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনী অথবা পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক মানবতার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধারার অপরাধ এটি।
গত বছর ৯ অক্টোবর বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ এলাকায় সন্ত্রাসীদের সমন্বিত হামলায় ৯ পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার হয়। দায় চাপানো হয় রোহিঙ্গাদের ওপর। শুরু হয় সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা দমন প্রক্রিয়া। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের দাবি, জঙ্গি দমনে রাখাইন রাজ্যে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চলছিলো। গত কয়েক মাসে ৭০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। আশ্রয় নেয় বাংলাদেশের শিবিরে। সেখানে থাকা ওই রোহিঙ্গাদের অনেকেই নানা অভিযোগের কথা তুলে ধরেন বিবিসির একজন প্রতিনিধির কাছে। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে, মানুষ হত্যা করেছে আর নারীদের ধর্ষণ করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায় তাদের কথায়। শরণার্থীদের অনেক বক্তব্যের সঙ্গে উপগ্রহ থেকে তোলা ছবি ও লুকিয়ে ধারণ করা ভিডিওর দৃশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যতা পাওয়া গেছে।
ভয়াবহ বিপন্নতার সেই রাখাইন রাজ্য সরেজমিন মিয়ানমার ঘুরে দেখার সুযোগ দেওয়া হয়নি ইয়াংহি লিকে। সু চিও তাকে সাক্ষাৎকার দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। রাখাইন রাজ্যের নিপীড়নকে মিয়ানমারের নিরাপত্তাবাহিনীগুলোর মধ্যে জারি থাকা কাঠামোবদ্ধ অপরাধ হিসেবেই দেখছে জাতিসংঘ। তবে লি জানিয়েছেন, নির্বাচিত সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে সু চি কে এর দায় নিতে হবে বলে মনে করছে জাতিসংঘ। তার ভাষ্য, ‘দিনের শেষে সরকারকেই উত্তর দিতে হবে। নিজ জনগণের বিরুদ্ধে এই ভয়াল নির্যাতন ও খুবই অমানবিক অপরাধের বিপুল ঘটনার প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে।’
সু চি রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোন সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন না। এমনকি ক্ষমতাগ্রহণের পর থেকে তিনি কোন সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছেন না। অবশ্য সু চির রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র উইন তেইন দাবি করছেন, এমন পরিস্থিতিতে সু চির পক্ষে সেনাবাহিনীকে থামানোর ক্ষমতা ছিল না। তবে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের যে অভিযোগ করেছেন ইয়াংহি লি, তার প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, এসব বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। তার ভাষ্য, ‘নতুন সরকার হিসেবে আমরা একটি আধুনিক দেশ গড়তে চাই। আমাদের হাজারো সমস্যা আছে। আমরা বিশ্বাস করি না যে, এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। এটি অভ্যন্তরীণ বিষয়, আন্তর্জাতিক ইস্যু নয়।’
সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তদন্তে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে মিয়ানমারের সরকার। এর প্রধানের দায়িত্বে আছেন সাবেক এক জেনারেল! জাতিসংঘ দূত ইয়াংহি লি এই কমিটিতে সামরিক বাহিনীর আধিপত্য ও এর তদন্ত পদ্ধতির কড়া সমালোচনা করেন। সোমবার লি তার অনুসন্ধানের ফলাফল জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে পেশ করবেন। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে একটি তদন্ত কমিশন গঠনের আহ্বান জানাবেন। এ ধরনের কমিশন উত্তর কোরিয়া ও সিরিয়ায় সংঘটিত অপরাধ তদন্তে গঠিত হয়েছিল। তবে এ কমিশনের প্রতি সমর্থন থাকবে কিনা, তা জানাতে রাজি নয় যুক্তরাজ্য ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের একটি খসড়া প্রস্তাবনায় অবশ্য অপেক্ষাকৃত দুর্বল একটি তদন্ত কমিশন গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর অনেকে চিন্তিত যে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কড়া কোনও পদক্ষেপ নিলে তা মিয়ানমারের অং সান সুচির গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

Leave a comment

ফেসবুকে আমরা

সর্বশেষ সংবাদ

উপরে