সরকারী ব্যাংকের নিট লোকসান হাজার কোটি টাকা

প্রকাশিত: ০৯-০৩-২০১৭, সময়: ১০:১৮ |
Share This

লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর। ২০১৬ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো নিট লোকসান করেছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংক একাই নিট লোকসান দিয়েছে ৮১৮ কোটি টাকার বেশি। নিট লোকসান করেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) ও রূপালী ব্যাংকও। পরিচালন অযোগ্যতা ও খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা খেয়ে ফেলছে বলে মনে করছেন ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা।

ব্যাংকের আয় থেকে যাবতীয় ব্যয় বাদ দিয়ে বছর শেষে পরিচালন মুনাফার হিসাব করা হয়। এর পর পরিচালন মুনাফা থেকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ ও সরকারকে কর পরিশোধ করার পর যে অর্থ থাকে, তা নিট মুনাফা হিসেবে ধরা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৬ সালে দেশের ৫৭টি ব্যাংক নিট মুনাফা করেছে ৮ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা। মুনাফার ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো ভালো করলেও রাষ্ট্রায়ত্ত অর্ধেক ব্যাংকই লোকসান দিয়েছে। সরকারি চারটি ব্যাংক মুনাফা করলেও বেসিক ব্যাংক ছাড়া বাকি তিনটি ব্যাংকের নিট মুনাফাই ২০১৫ সালের তুলনায় কমেছে।

সোনালী ব্যাংক: ২০১৬ সালে খেলাপি ঋণ, পরিচালন ও নিট মুনাফা, সম্পদের বিপরীতে আয়সহ সবক’টি সূচকেই রাষ্ট্রায়ত্ত সবচেয়ে বড় সোনালী ব্যাংকের বিপর্যয় হয়েছে। ২০১৫ সালে ব্যাংকটি ৫৪ কোটি টাকার নিট মুনাফা করলেও ২০১৬ সালে ৮১৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা নিট লোকসান দিয়েছে। ১ লাখ ২১ হাজার ৮১১ কোটি টাকা সম্পদের সোনালী ব্যাংকের গত বছর রিটার্ন অন অ্যাসেট (আরওএ) ছিল ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ, যেখানে দেশের বেসরকারি ও বিদেশী খাতের কোনো কোনো ব্যাংকের রিটার্ন অন অ্যাসেট ছিল ৩ শতাংশেরও বেশি। বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও ২০১৪ সালে সোনালী ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ৬০৫ কোটি ও ২০১৩ সালে ৩৫৮ কোটি টাকা।

২০১৫ সাল শেষে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ১০০ কোটি টাকা, যা ছিল ওই সময়ে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ২৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ২০১৬ সাল শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ১২৯ কোটি টাকা বেড়ে ১০ হাজার ২২৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাত্ ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ৩১ দশমিক ৩৩ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে। নতুন করে খেলাপি হওয়া ঋণের বিপরীতে ব্যাংকটিকে সঞ্চিতি রাখতে হয়েছে ১ হাজার ২২২ কোটি টাকা।

কৃষি ব্যাংক: ধারাবাহিক লোকসানে থাকা কৃষি ব্যাংক আরো বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়েছে। ২০১৬ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর মেয়াদেই ব্যাংকটির নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩৮৮ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরেও ৬০৫ কোটি টাকার লোকসান দিয়েছে কৃষি ব্যাংক।

২০১২ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটির বার্ষিক লোকসান ২০০ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এর পর থেকে লাগামহীনভাবে বাড়ছে লোকসানের পরিমাণ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে কৃষি ব্যাংকের লোকসান দাঁড়ায় ৩৮৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪৯৫ কোটি ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৪৩৪ কোটি টাকা নিট লোকসান দিয়েছে ব্যাংকটি। অব্যাহত লোকসানের কারণে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে কৃষি ব্যাংক। অথচ ২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত কৃষি ব্যাংককে ২ হাজার ১৪০ কোটি ৫২ লাখ টাকার মূলধন জোগান দিয়েছে সরকার। ব্যাংকটির বর্তমানে ১ হাজার ২৯টি শাখার মধ্যে প্রায় ২৫০টিই লোকসানে রয়েছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য চালু করা ব্যাংকটির সব শাখাই লোকসানে।

ধারাবাহিক লোকসানের পাশাপাশি খেলাপি ঋণের পরিমাণও বাড়ছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। ২০১৫ সাল শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৭০ কোটি টাকা। ২০১৬ সাল শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকায়। এ হিসাবে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ২৭ দশমিক ১৫ শতাংশই খেলাপি হয়ে গেছে।

রূপালী ব্যাংক: সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নিয়মবহির্ভূত ঋণ বিতরণের কারণে ২০১৬ সালে লোকসান দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক। বছর শেষে ব্যাংকটির নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৪৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। যদিও গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান ছিল ২৭৪ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৫ সালে ২৩ কোটি, ২০১৪ সালে ৪৯ কোটি ও ২০১৩ সালে ৪২ কোটি টাকা নিট মুনাফা দেখিয়েছিল ব্যাংকটি।

২০১৫ সাল শেষে রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা। ২০১৬ সাল শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ১৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ খেলাপি।

রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতাউর রহমান প্রধান বণিক বার্তাকে বলেন, অতীতে প্রভিশনিংসহ হিসাবায়ন যথাযথভাবে না করার কারণে রূপালী ব্যাংক কৃত্রিম মুনাফায় ছিল। যোগদানের পর আমি সবার সহযোগিতায় ব্যাংকের প্রকৃত চিত্র বের করার চেষ্টা করেছি। গত সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে রূপালী ব্যাংক ২৭৪ কোটি টাকার লোকসানে ছিল। কিন্তু ডিসেম্বর পর্যন্ত আমরা কার্যকর তত্পরতা চালিয়ে খেলাপি ঋণ থেকে আদায় বাড়িয়েছি, যার কারণে বছর শেষে লোকসানের পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। আশা করছি, চলতি বছরেই মুনাফায় ফিরবে রূপালী ব্যাংক।

জনতা ব্যাংক: রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক ২০১৬ সালে ১ হাজার ১০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করলেও খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণ করতে গিয়ে নিট মুনাফা কমেছে ব্যাংকটির। ২০১৬ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। যদিও ২০১৫ সালে ৪৮০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছিল ব্যাংকটি। তার আগে ২০১৪ সালে জনতা ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ৩৮১ কোটি ও ২০১৩ সালে ৯৫৫ কোটি টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ মুনাফা করলেও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ। ২০১৫ সালে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ১ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা বেড়ে তা ৪ হাজার ১৬৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ১১ দশমিক ৪৬ শতাংশ খেলাপি হয়ে গেছে। নতুন করে খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণের বিপরীতে গত বছর পরিচালন মুনাফা থেকে ৬৫১ কোটি টাকা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করেছে জনতা ব্যাংক।

অগ্রণী ব্যাংক: ৫৮৯ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করলেও নিট মুনাফায় বিপর্যয় হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের। ২০১৬ সালে ব্যাংকটি নিট মুনাফা করেছে মাত্র ৬০ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৫ সালে ৬৫ কোটি, ২০১৪ সালে ১৯৯ কোটি ও ২০১৩ সালে ৯০৫ কোটি টাকার নিট মুনাফায় ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকটি।

ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আবদুল হামিদের বিতরণ করা ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ। ২০১৫ সাল শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৪ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। ২০১৬ সাল শেষে তা বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ২৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। বড় অংকের খেলাপি ঋণের বিপরীতে ৭৩১ কোটি টাকার সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হয়েছে ব্যাংকটিকে।

বেসিক ব্যাংক: আর্থিক বিপর্যয়ে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক ২০১৬ সালে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও ২০১৫ সালে ব্যাংকটির নিট লোকসানের পরিমাণ ছিল ৩১৪ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৪ সালে ১১০ কোটি ও ২০১৩ সালে ৫৩ কোটি টাকা লোকসান করে ব্যাংকটি।

মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে আর্থিক বিপর্যয় থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিলেও ২০১৬ সালে ৮৩৭ কোটি ২২ লাখ টাকার খেলাপি ঋণ বেড়েছে বেসিক ব্যাংকের। ২০১৫ সাল শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৬ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। ২০১৬ সাল শেষে বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭ হাজার ২২৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। নতুন বৃদ্ধি পাওয়া বড় অংকের খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকটি প্রভিশন সংরক্ষণ করেছে মাত্র ৩ কোটি টাকা। যদিও ব্যাংকটির ৪ হাজার ৬৩ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে বেসিক ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের ৫৪ শতাংশই রয়েছে খেলাপির খাতায়।

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ৩০ কোটি ৪১ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক গত বছর ৪৪ কোটি ২০ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার কারণেও ব্যাংকের আয় কমেছে। খেলাপি ঋণের বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে গিয়ে এ খাতের ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফা কমে গেছে। এক্ষেত্রে কিছু ব্যাংক লোকসানও করেছে। পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক যথাযথ তত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছে।বণিকবার্তা ।

Leave a comment

ফেসবুকে আমরা

সর্বশেষ সংবাদ

উপরে