খালেদার দুই মামলা বিএনপির শঙ্কা

প্রকাশিত: ০৯-০৩-২০১৭, সময়: ০৭:০৮ |
Share This

বাংলাদেশ মেইল রিপোর্ট : খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিচারাধীন দুটি দুর্নীতির মামলার সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে, তা আলোচনার মূল বিষয় হয়ে উঠেছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ এবং তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপিতে। বুধবার হাইকোর্ট আদালত পরিবর্তন এবং ৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার নির্দেশ দেয়ার পর এই আলোচনা আরও জোরদার হয়।

মামলা দুটির বিচারে সম্ভাব্য নেতিবাচক পরিণতি সম্পর্কে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে অস্বস্তি ও শঙ্কা আছে। তবে সরকারের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ের ক্ষেত্রে সরকার অহেতুক তাড়াহুড়া করবে না। খালেদা জিয়া সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার- জনমনে এমন ধারণা এড়াতেই এ পরিকল্পনা। এ জন্য খালেদা জিয়াকে আইনের সম্ভাব্য সব সুরক্ষা নেয়ার সুযোগ দেয়া হবে।

সরকার ও ক্ষমতাসীন ১৪-দলীয় জোটের নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার নিশ্চিত যে বিচারিক আদালতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন শাস্তি এড়াতে পারবেন না। বড়জোর সময়ক্ষেপণ করতে পারবেন। সরকারও তাঁকে পর্যাপ্ত সময় দিয়েছে। বিচারিক আদালতের রায়ের পর উচ্চ আদালতে গিয়েও বিএনপির চেয়ারপারসন সময়ক্ষেপণ করতে চাইবেন। সেটাও সরকারের বিবেচনায় আছে।

বিএনপির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বুধবার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলাটি ঢাকা-৩ নম্বর বিশেষ জজ আদালত থেকে ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ আদালতে (মহানগর দায়রা জজ) বদলির আদেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ৬০ দিনের মধ্যে মামলার বিচারকাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ সময়সীমাকে বিএনপির ওপর নতুন চাপ বলে মনে করছেন অনেকে। যদিও দলটির নেতা ও আইনজীবীরা চাপ মনে করছেন না।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ৬০ দিনের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি করার নির্দেশ বাড়তি কোনো চাপ নয়। হাইকোর্ট যা বলেছেন, তা হচ্ছে ট্রাইব্যুনাল আইনের বিধান। অর্থাৎ ট্রাইব্যুনালের যেকোনো মামলা ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার বিধান রয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে, ন্যায়বিচারের স্বার্থেই আদালতকে সময় বৃদ্ধি করতে হয়।

বিএনপির সূত্রে জানা গেছে, হাইকোর্টের আদালত বদলির আদেশকে বিএনপি ইতিবাচকভাবে দেখছে। তারা মনে করছে, বিচারের চূড়ান্ত পর্যায় থেকে মামলাটি একটি নতুন জায়গায় এসেছে। এতে আরও কিছুদিন সময় পাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এখন বিএনপি নতুন আদালতে মামলাটিতে নতুন করে সাক্ষ্য গ্রহণের আবেদন জানানোর চিন্তা করছে। দলটির নেতারা মনে করছেন, ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালত যাতে যথার্থ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সে জন্য নতুন সাক্ষ্য গ্রহণ করা সমুচিত হবে। এতে আইনি কোনো বাধাও নেই।

আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মামলার যে বিষয়বস্তু, তাতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার জেতার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এই মামলা থেকে তাঁর পক্ষে রাজনৈতিক অর্জনেরও সুযোগ কম। খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে এবং বড় ধরনের প্রতিবাদ জানাবে, এটা সরকার মনে করছে না।

তবে আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র বলছে, খালেদা জিয়া একটি বড় দলের প্রধান। রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের কারণে সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হলেও তাঁর বিপুল সমর্থক রয়েছে। তাঁর সাজা হলে প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আগাম ভেবে রেখেছে সরকার। তবে তাঁদের মনে হয়েছে, আইনি সব প্রক্রিয়া শেষ করে আদালত শাস্তি দিলে দেশে-বিদেশে সমালোচনা কম হবে।

উল্লেখ্য, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া, তাঁর ছেলে তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ মামলায় ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। বুধবার হাইকোর্টের রায়ের পর মামলাটি এখন অন্য আদালতে চলবে।

আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগ এনে দুদক অপর মামলাটি করে ২০১১ সালের ৮ আগস্ট। তেজগাঁও থানায় করা এ মামলায় খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। মামলাটির বিচারকাজ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে।

বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের একটি অংশ বলছে, সরকার মামলা দুটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের ধারণা, এ ক্ষেত্রে সরকার দুটি কৌশল নিয়ে এগোনোর চেষ্টা করতে পারে। প্রথমত, মামলা দুটিতে সাজার মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে দূরে রাখা। এরপর দলে বিভক্তি সৃষ্টি করে একটি অংশকে নির্বাচনে আনা। অথবা মামলা দুটিকে চূড়ান্ত পর্যায়ে রেখে খালেদা জিয়াকে আগামী নির্বাচন প্রশ্নে একটি সমঝোতায় যেতে বাধ্য করা। এ ক্ষেত্রে বিএনপিকে বিরোধী দলের আসনে বসানোর কথা বিভিন্ন মহলে দীর্ঘদিন থেকে আলোচনায় আছে।

খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচন হতে পারবে না- সম্প্রতি এমন বক্তব্য দিয়েছেন বিএনপির নেতা রুহুল কবির রিজভী। জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আমরা কি বলেছি, খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠাব? আমরা তো তা বলিনি। আমাদের এমপি রানা, বদি জেলে আছেন। দুজন মন্ত্রী প্রতি সপ্তাহে দুদকের মামলায় আদালতে হাজিরা দিচ্ছেন। আমরা কি সেখানে হস্তক্ষেপ করেছি? বিএনপির নেতারাই তো রায় সাজাচ্ছেন। তিনি (খালেদা জিয়া) সাজা নাও তো পেতে পারেন। এটা আদালতের ব্যাপার।’

এ পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়ার মামলার ভবিষ্যৎ, সাজা হলে দলটির কী অবস্থা হবে এবং আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি আসবে কি না- এসব বিষয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন চলছে। আওয়ামী লীগ ও তাদের জোট ১৪ দলের অনেকেই মনে করেন, খালেদা জিয়ার সাজা হলে বিএনপি ভেঙে যেতে পারে। আর না ভাঙলেও অনৈক্যে শক্তি ক্ষীণ হয়ে পড়বে। তখন নির্বাচনে গেলেও বিএনপি সুবিধা করতে পারবে না। আবার নির্বাচনে না গেলে রাজনীতির মাঠে অবস্থান হারাবে।

রাজনীতির এই আলোচনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেন, এটা বিচারাধীন বিষয়। আদালত সাজা দিলে রাজনৈতিক প্রভাব এক রকম হবে, না দিলে আরেক রকম হবে। বিচারাধীন বিষয়ে মন্তব্য করাটা শোভনীয় নয় বলে মনে করেন তিনি।

Leave a comment

ফেসবুকে আমরা

সর্বশেষ সংবাদ

উপরে