তাজরীনের অগ্নিকাণ্ডের ৭ বছরেও সঠিক বিচার ও ক্ষতিপূরণ পায়নি শ্রমিকরা

আওরঙ্গজেব কামাল : আজ ২৪ নভেম্বর পোশাক শ্রমিকদের জন্য একটি ভয়াভয় দিন ।এই দেনে ঢাকা জেলার আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় অবস্থিত তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেড কারখানায় ২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর সংঘটিত একটি মারাত্মক অগ্নিকাণ্ড । যাতে মোট ১১৭ জন পোষাক শ্রমিক নিহত হয় এবং ২০০ জনের অধিক শ্রমিক আহত হয়। ভয়ানক এই দুর্ঘটনায় ঐ পোশাক কারখানার নয়তলা ভবনের ছয়তলা ভস্মীভূত হয়ে যায়। সরাসরি আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায় ১০১ জন পোষাক শ্রমিক ও আগুন থেকে রেহাই পেতে ওপর থেকে লাফিয়ে পড়ে মৃত্যু হয় আরও ১০ জনের। এটি দেশের ইতিহাসে পোশাক কারখানায় সবচেয়ে মারাত্মক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার মধ্যে একটি। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটের কারণে আগুন লেগেছিল বলে ধারণা করা হয়, কিন্তু সে সময় সংসদের এক আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, এ ঘটনা পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে । এই ঘটনা ও পরে অনুরূপ কিছু ঘটনার পর বাংলাদেশের শ্রমিক অধিকার ও নিরাপত্তা আইনগুলিতে নানাবিধ সংস্কারের প্রস্তাব করা হয়। এই ভয়াবহ অগ্নিঘটনার কারণ নিরূপণ করতে বাংলাদেশ সরকারের তরফ থেকে চার দফা তদন্তের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর এবং বাংলাদেশ পুলিশ – সরকারের এই চারটি অঙ্গ পৃথক পৃথক তদন্ত কার্যক্রম গ্রহণ করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি ১৭ ডিসেম্বর ২০১২ তারিখে ‘আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে অবস্থিত তাজরীন ফ্যাশন লিমিটিড এ সংঘটিত মর্মান্তিক অগ্নিকান্ডের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন’ শিরোনামে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।প্রতিবেদনে তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেড এর মালিককে দণ্ড-বিধির ৩০৪ (ক) ধারায় আইনের আওতায় এনে বিচারে সোপর্দ করার সুপারিশ করা হয়। তাজরীন ফ্যাশন গার্মেন্টস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পরদিন আশুলিয়া থানার এসআই খায়রুল ইসলাম একটি মামলা করেন। অগ্নিকাণ্ডের এক বছর পর ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) পরিদর্শক একেএম মহসিনুজ্জামান খান আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। পুলিশ তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডের মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেনকে গ্রেফতারের জন্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ২০১৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন আদালত। ২০১৯ সালে ১০৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ৭ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আসামিরা হলেন- তাজরীনের এমডি মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন, তাঁর স্ত্রী ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তার, প্রকৌশলী এম মাহবুবুল মোর্শেদ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা দুলাল, স্টোর ইনচার্জ হামিদুল ইসলামসহ ১৩ জন। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানাযায় তাজরীনের ঘটনায় ২০১৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাজরীন ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেনসহ ১৩ জনকে বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য করা হয়। তবে ঠিকমতো সাক্ষী হাজির করতে না পেরে বেশ কয়েকবার সময় নেয় রাষ্ট্রপক্ষ। একাধিক তথ্য থেকে জানাযায় ৭ বছর আগে আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেড নামের একটি কারখানায় বাংলাদেশে পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর পোশাক কারখানাগুলোয় নিরাপত্তা বাড়ানোর ক্ষেত্রে অনেকটা অগ্রগতি হলেও শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে কারখানায় সম্পূর্ণ নিরাপদ বোধ করার মত পরিস্থিতি এখনও হয়নি। এ ছাড়া সঠিক বিচার ও শ্রমিকদের দাবী পুরোন এখনো হয়নি। তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আহত শ্রমিকদের অভিযোগ সাত বছরেও কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি । আহত শ্রমিকদের অনেকে কর্মক্ষমতা হারিয়ে বেকার জীবনযাপনে নিজেদের চিকিৎসার ব্যয় বহনে অপারগ যাদের অনেকেই।ঘটনার দিন আগুন থেকে বাঁচতে তিনতলা থেকে লাফ দিয়ে মারাত্মকভাবে আহত হন ময়মনসিংহের জরিনা। অনেকের আশ্বাস, বহু জায়গায় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি তিনি। আশুলিয়ার নিশ্টিন্তপুরে কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশের এক পিঠা বিক্রেতা নারী শ্রমিক বলেন, কোনো কাজকর্ম আমি করতে পারি না।ছেলে মেয়েনিয়ে খুব অসুবিধায় রযেছি। এখন সরকারী চিকিৎস্যা বন্ধ। ফলে ওষুধ ক্রয় ও সংসার চলা বড় দায়।সাত বছর ধরে ক্ষতিপূরণের আশায় থাকা রেহেনা বেগম বলেন, “আহত হওয়ার পর নারী ও শিশু হাসপাতালে বেশ কয়েক মাস চিকিৎসা নিয়েছি। তখন তো আমার কোনো টাকা-পয়সা লাগেনি।কিন্ত এখন অর কেহ আমাদের দিকে খেয়াল রাখেন না। এদিকে বিচার প্রক্রিয়ার অভিযোগপত্রে বলা হয়, কারখানা ভবনটি ইমারত নির্মাণ আইন মেনে করা হয়নি। শ্রমিকদের বের হওয়ার জন্য ভবনটিতে জরুরি বহির্গমন পথ ছিল না। তিনটি সিঁড়ির মধ্যে দুটি নিচতলার গুদামের ভেতরে এসে শেষ হয়েছে। ওই গুদামে আগুন লাগার পর শ্রমিকেরা বের হতে চাইলে কারাখানার ম্যানেজার শ্রমিকদের বাধা দিয়ে বলেন, আগুন লাগেনি। অগ্নিনির্বাপণের মহড়া চলছে। তিনি বের হওয়ার পথ বন্ধ করে দেন। ফলে শ্রমিকেরা নিচে নামতে পারেননি। মালিকের অবহেলাজনিত হত্যা ও নরহত্যার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে বলে উল্লেখ করে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩২৫, ৪৩৬, ৩০৪, ৩০৪-ক ও ৪২৭ ধারায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। এখন শ্রমিকদের প্রশ্ন এই দেশে অনেক বিচার স্বল্পসময়ে শেষ হয়েছে কিন্ত এত বড় একটি ঘটনার বিচার কেন এত দিনে শেষ হয়নি ? সাত বছর পার হলেও এখনও বিচার পায়নি নিহতদের পরিবার। তাজরীন ফ্যাশনস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও মালিকের শাস্তির দাবি শ্রমিকদের। রবিবার সকালেই কারখানার সামনে ফুল দিয়ে নিহত শ্রমিকদের শ্রদ্ধা জানিয়েছে তাদের স্বজন, আহত শ্রমিক ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন। সকাল ৮টা থেকে নিশ্চিন্তপুর এলাকার বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে ফুল দিয়ে নিহত শ্রমিকদের শ্রদ্ধা জানানো হয়। এছাড়া নিহত শ্রমিকদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়াও করা হয়।

ভয়াবহ সেই অগ্নিকাণ্ডের সাত বছর পূর্তি উপলক্ষে নিহতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন করেছেন আহত শ্রমিক ও নিহতদের স্বজনরা। গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) ও ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিল (আবিসি), সাভার-আশুলিয়া কমিটির উদ্যোগে তাজরীন ফ্যাশনসের পরিত্যক্ত কারখানার সামনে এই মোমবাতি প্রজ্বালন করা হয়। এ সময় মোমবাতি হাতে ‘তাজরীন, টাম্পাকো, রানা—আর না, আর না’ এই স্লোগান তুলে নিহতদের স্মরণ করা হয়। এ ছাড়া শ্রমিকদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়।

Comments

comments

সম্পাদক ও প্রকাশক : ডাঃ আওরঙ্গজেব কামাল
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : ইজ্ঞি: মোঃ হোসেন ভূইয়া।
বার্তা সম্পাদক : জহিরুল ইসলাম লিটন
যুগ্ন-সম্পাদক : শামীম আহম্মেদ

ঢাকা অফিস : জীবন বীমা টাওয়ার,১০ দিলকুশা বানিজ্যিক (১০ তলা) এলাকা,ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ ০১৭১৬-১৮৪৪১১,০১৯৪৪২৩৮৭৩৮

E-mail:dnanewsbd@gmail.com

© 2011 Allrights reserved to Daily Detectivenews