কালীগঞ্জের সুলতানী আমলের মসজিদসহ মূল্যবান প্রত্নতাত্তিক সম্পদের সংরক্ষন প্রয়োজন

ফিরোজ আহম্মেদ,কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : এক সময়ে বারো আউলিয়ার বাস ছিল তাই নাম হয়েছে বারোবাজার। আবার অনেকের ধারনা প্রাচীনকালে এ স্থানটিতে রাজা বাদশারা বাস করতেন যে কারনে আশপাশেই বারটি স্থানে বাজার বসতো তাই এ জায়গার নাম হয়েছে বারোবাজার। নামকরণ যেভাবেই হোক না কেন এখানে রয়েছে প্রাচীন কালের রাজা বাদশাদের তৈরী কীর্তি ও প্রতœতাত্তিক নিদর্শন। যে গুলোর জন্য এখনই যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ধবংস হয়ে যাবে প্রায় ৫’শ বছর আগের নির্মান করা মসজিদসহ নানা ধরনের প্রতœতাত্তিক সম্পদ। যা দেখার জন্য প্রতিদিন দেশ বিদেশের অনেক দর্শনার্থীরা ভীড় জমায়। মসজিদগুলো দাড়িয়ে আছে ঢাকা খুলনা মহাসড়কের পাশে কালীগঞ্জ – যশোরের মধ্যবর্তী স্থান ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দক্ষিণে বারোবাজার নামক স্থানে। সরেজমিনে এ এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এখানে রয়েছে বেশ কিছু মসজিদ,প্রাচীন মাজার ও বড় বড় দীঘি। মসজিদ গুলো অধিকাংশ এ সকল দীঘির পাড়েই অবস্থিত। মসজিদ গুলো থেকে দীঘি পর্যন্ত সিড়ি করা। বারোবাজারের দেড় কিলোমিটার পূর্বে রয়েছে গাজী কালু চম্পাবতীর মাজার। বারবাজার থেকে পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে ধোপাদি যাত্রাপুর গ্রামে রয়েছে একটি মঠ। পুরাতন ভৈরব নদীর উত্তর পাড়েই রয়েছে প্রাচীন জাহাজঘাটা। বারোবাজার থেকে ৩ কিলোমিটার পশ্চিমে বারবাজার তাহিরপুর সড়কের সাতগাছিয়া গ্রামে রয়েছে আদিনা মসজিদ,বাজারের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে গোড়ার মসজিদ, তার ৫’শ গজ পশ্চিমপাশে রয়েছে গলাকাটা মসজিদ, এটির ৪’শ গজ পশ্চিমে জোড় বাংলা মসজিদ, বারোবাজার থেকে দেড় কিলোমিটার পশ্চিমে রয়েছে সাদিকপুর চেরাগদানী মসজিদ,বেলাট গ্রামে রয়েছে পীরপুকুর মসজিদ, বারোবাজারের দক্ষিণ পশ্চিমে হাসিলবাগ গ্রামে রয়েছে শুকুর মল্লিক মসজিদ,ঠিক এর পাশের মিঠাপুকুর গ্রামে রয়েছে নুন গোলা পুকুর মসজিদ, বাজারের পাশেই রয়েছে পাঠাগার মসজিদ। এ সকল মসজিদগুলো দীর্ঘদিন ধরে ছিল মাটির নীচে চাপা পড়া।এগুলো যে অত্যন্ত প্রাচীন তা খনন করার সময় প্রাপ্ত শিলালিপি দেখে জানা যায় যে, মসজিদগুলো আজ হতে আনুমানিক ৫’শ থেকে সাড়ে ৫’শ বছর আগে সুলতানী শাসন আমলের তৈরী। যে গুলো কালের বিবর্তনে মাটির নীচে চাপা পড়ে বন বাদাড়ের ঢিবি তৈরী হয়েছিল। এক সময় এ জনপদে বাস করতেন প্রাচীন রাজারা ফলে মাটির নীচে চাপা পড়া উঁচু ঢিবিগুলোর নীচে রাজা বাদশাদের প্রাসাদ হতে পারে এমন ধারনা ছিল এ অঞ্চলের বসবাসকারী মানুষের। পাকিস্থান আমলে সাতগাছিয়া গ্রামের জনৈক কেনার উদ্দীন এখন যেটি(আদিনা মসজিদ নামে পরিচিত )সেখানটিতে বাড়ি তৈরী করার জন্য ঢিবি খুঁড়তে খুঁড়তে মসজিদের আলামত দেখতে পান তখন তিনি ঢিবি খুঁড়া বন্ধ করে দেন। এরপর থেকে মানুষের মাঝে এ জনপদের বিভ্ন্নি গ্রামের উঁচু ঢিবি গুলোর মাটির নীচে মসজিদ থাকতে পারে এমন ধারনা আসে। যা সরকারী ভাবে খনন করার জন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করে আসছিলেন। ইতোমধ্যে কিছু ঢিবি খননের মাধ্যমে মসজিদ বের করা হলেও এখনও বাকি রয়েছে অনেকগুলো ঢিবি। যে ঢিবি গুলোর নীচে মসজিদ আছে বলে সকলের ধারনা। এছাড়াও এ অঞ্চলে রয়েছে শতাধিক পুরাতন পুকুর ও দীঘি। তার মধ্যে অন্যতম পীর পুকুর, গোড়ার পুকুর,সাতপীরের পুকুর, ভাই বোনের দীঘি, আনন্দ পুকুর, গলা কাটা দীঘি, জোড় বাংলা দীঘি, চেরাগদানি দীঘি, নুন গোলা দীঘি, কানাই দীঘি, পাঁচ পীরের দীঘি, মনোহর দীঘি, আদিনা দীঘি, শ্রীরাম রাজার বেড় দীঘি উল্লেখযোগ্য। এক সময় বারোবাজার ছিল সমৃদ্ধশালী প্রাচীন নগরী। এটি ভৈরব নদীর তীরে অবস্থিত। সে সময়ে গৌড় পাটলীপুত্র থেকে পূর্বাঞ্চালে আসতে হলে প্রথম সোপান ছিল বারোবাজার। জানা যায়, সে সময়ে ভৈরব নদ দিয়ে দেশ বিদেশ থেকে সওদাগরেরা আসতেন পণ্য সম্ভার নিয়ে। যার প্রমান পাওয়া যায় বারোবাজারের অদূরে হাসিলবাগের জাহাজঘাটা দেখে। ঢিবি খুঁড়ে বের করা মসজিদগুলো থেকে যে পাথর পাওয়া গেছে একই ধরনের পাথর রয়েছে বাগেরহাট খান জাহান আলী মসজিদে। লুপ্ত বারোবাজার কারা প্রতিষ্ঠিত করেন তা নিয়ে রয়েছে নানা ধরনের মতবাদ। কেউ কেউ মনে করেন সিলেট অঞ্চল থেকে ১২ জন আওলিয়া ধর্ম প্রচারের জন্য হযরত বড়খান গাজীর সাথে এসে এখানে আস্তানা গাড়েন। তাদের নামানুসারে বারোবাজারের নামকরণ করা হয়েছে। আবার অনেকের মতে হযরত খানজাহান আলী (রাঃ) এর সাথে ১২ জন দরবেশ বাগেরহাট পৌছানোর আগে এখানে আস্তানা গেড়ে ইসলাম প্রচার করেন। তাদের নামানুসারে এ এলাকার নাম হয় বারোবাজার। তথ্যানুসন্ধান করে জানা যায় প্রাচীনকালে এ জনপদের পরিধি ছিল ১০ বর্গমাইল। এর মধ্যকার গ্রামগুলো ছিল যথাক্রমে খোশালপুর, পিরোজপুর, বাদুরগাছা, সাদেকপুর এনায়েতপুর মুরাদগড়, রহমতপুর ,মোল্যাডাঙ্গা, বাদেডিহি, দৌলতপুর, সাতগাছিয়া, বেলাট প্রভৃতি। তখন এ ১২ টি গ্রামে বাজার বসতো তাই নাম হয়েছে বারোবাজার। ১২ জন পীর আওলিয়ার নামে বাজারগুলোর নামকরণও করা হয়। যেমন এনায়েত খাঁয়ের নামানুসারে এনায়েতপুর, আব্দাল খাঁয়ের নামে আব্দালপুর, দৌলত খাঁয়ের নামে দৌলতপুর, হৈবত খাঁয়ের নামে হৈবতপুর, নিয়াজ মন্দ খাঁয়ের নামে নিশ্চিন্তপুর, গনিমত খাঁয়ের নামে গরিনাথপুর, বেলায়েত খাঁয়ের নামে বেলাট ,শাহবাজ খাঁয়ের নামে শাহবাজপুর, রহমত খাঁয়ের নামে রহমতপুর। এসব গ্রামগুলো ঝিনাইদহ কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজার ও পার্শবর্তী যশোর এলাকায় বিদ্যমান। ইতিহাস থেকে জানাযায়, এক সময় বারোবাজার ছিল প্রাচীন হিন্দু ও বৌদ্ধ রাজাদের রাজধানী। গ্রীক ইতিহাস প্রথম শতকে গঙ্গারিডি বা গাঙ্গেয় রাজ্যের উেেল্লখ পাওয়া যায়। ঐতিহাসিক তথ্যনির্ভর বিবরণ হচেছ প্রথম থেকে পঞ্চম শতাব্দি পর্যন্ত বারোবাজার যশোরের সাথে একীভূত হয়ে বঙ্গের অধীনে ছিল ৭ম শতাব্দিতে শশাঙ্কের অধীনে যায়। সপ্তম শতাব্দির মধ্যভাগ থেকে যশোর, যশোমনির পূর্ব আমল পর্যন্ত বৌদ্ধ শাসনাধীনে আসে।১০৮০ সাল পর্যন্ত পাল রাজারা এবং ১১৫০ সাল পর্যন্ত বর্মন রাজারা এখানে রাজত্ব করেন। ১২০৪ সাল পর্যন্ত যশোর সেন রাজাদের অধীনে ছিল। এরপর সিলেট থেকে সুন্দরবন হয়ে হযরত বড়খান গাজী ১২৪০ থেকে ১২৫০ সালের মধ্যে কোন এক সময়ে এ অঞ্চলে আগমন করেন। তিনি ছাপাই নগরের (বর্তমান বারোবাজারের পূর্বাংশ ) রাজা শ্রীরামকে পরাজিত করে বারোবাজার দখল করেন। হযরত বড়খানগাজীর পরে এখানে আসেন কামেল দরবেশ উলুঘ খান-ই- জাহান। অন্যমতে আছে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজীর বঙ্গ বিজয়ের পরে এ অঞ্চল প্রথম মুসলিম শাসনে আসে। এরপর ১৪৮৭ সালে ক্ষমতায় আসে দাস বংশ। তাদের পতনের পর ১৪৯৩ সালে ক্ষমতায় আসে সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ। ১৫৩৮ পরবর্তীতে ক্ষমতায় আসেন যথাক্রমে পাঠান, মোঘলরা। এ আমলে রাজা সীতারামের পতনের পর বৃহত্তর যশোরের কয়েকটি জমিদারী অর্ন্তভুক্ত হয়ে যায়। এ সময়ে বারোবাজার নলডাঙ্গা রাজার অধীনে চলে আসে। গৌড়ের শাসনকর্তা দাউদের প্রতিনিধি শ্রীহরি ১৫৭৪ সালে যশোরের স্বাধীনতা ঘোষনা করে বিক্রমাদিত্য নাম নিয়ে যশোরের শাসন কাজ পরিচালনা শুরু করেন। এরপর তারপুত্র প্রতাপাদিত্য ১৫৮৭ সালে এখানকার রাজা হন। প্রতাপাদিত্য ছিলেন বারো ভূঁইয়াদের একজন। সুলতানী আমলের অবসানের পরে বারোবাজারের গুরুত্ব কমে আসে ফলে মোঘলদের কীতির কিছুই নেই বারোবাজারে। বারো বাজার অঞ্চলে চাষাবাদের সময় অথবা মাটি খননের সময়ে এখন ও মানুষের কঙ্কাল পাওয়া যায়। পুকুর খননের সময় অনেকগুলো হাতির কঙ্কাল পাওয়া গেছে। ফলে এ অঞ্চলের মানুষেরা ধারনা করেন এক সময়ের সমৃদ্ধ নগরীতে অসংখ্য মানুষ কোন ভয়াবহ যুদ্ধ, মহামারি অথবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা গেছে। যে কারনে এলাকাটি দীর্ঘদিন জঙ্গলাকীর্ন হয়ে পড়ে এবং মনুষ্য বসতি গড়ে ওঠেনি। এমনিভাবে প্রতœতাত্তিক নিদর্শনগুলি কালের গ্রাসে ধবংস স্তুপে পরিনত হয়েছে। যে সকল ঢিবি খনন করা হয়েছে তার সবগুলোই ভাঙ্গা মসজিদ। যে মসজিদ গুলোর দেওয়ালে ফুল লতা পাতার নকশা বিদ্যমান। এ অঞ্চলে মোট ১৬ টি মসজিদ পাওয়া গেছে যেগুলোর মধ্যে কিছু খনন করা হলেও বেশির ভাগ রয়েছে সংস্কারবিহীন।

Comments

comments

সম্পাদক ও প্রকাশক : ডাঃ আওরঙ্গজেব কামাল
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : ইজ্ঞি: মোঃ হোসেন ভূইয়া।
বার্তা সম্পাদক : জহিরুল ইসলাম লিটন
যুগ্ন-সম্পাদক : শামীম আহম্মেদ

ঢাকা অফিস : জীবন বীমা টাওয়ার,১০ দিলকুশা বানিজ্যিক (১০ তলা) এলাকা,ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ ০১৭১৬-১৮৪৪১১,০১৯৪৪২৩৮৭৩৮

E-mail:dnanewsbd@gmail.com

© 2011 Allrights reserved to Daily Detectivenews