অস্ত্র ও মাদক মামলা সম্রাট ১০ দিনের রিমান্ডে

ডেস্ক রিপোর্ট : পাপ কখনো বাপেরে ছারেনা । অপরাধী যতই ক্ষমতাধর হোকনা কেন তাকে এক দিন না একদিন সাজা পেতে হবে। অস্ত্র ও মাদক আইনের দুই মামলায় ক্যাসিনো গডফাদার যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাটকে ১০ দিনের রিমান্ড দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম মো. তোফাজ্জল হোসেন রিমান্ডের এ আদেশ দেন।এছাড়া তার সহযোগী এনামুল হক আরমানকে মাদক মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।সম্রাটের রিমান্ড শুনানি উপলক্ষে এদিন আদালত চত্বরে দলের নেতাকর্মীরা শোডাউন করেন। সকাল থেকেই তাদের ভিড় বাড়তে থাকে। গেটের বাইরে ও জনসন রোডে জটলা করে তারা স্লোগান দেয়। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশি নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়। শুনানি শেষে দুপুরের পর সম্রাটকে রিমান্ডের জন্য আদালতের হাজতখানা থেকে রমনা থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।দুপুর ১২টা ৪২ মিনিটে সহযোগীসহ সম্রাটকে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। হাতকড়া পরিয়ে তাদের এজলাসের ডকে (আসামির রাখার নির্ধারিত স্থান) রাখা হয়। এর দুই মিনিটের মধ্যেই আদালতে বিচারক আসেন।
প্রথমে রমনা থানায় দায়ের করা দুই মামলায় সম্রাটকে এবং মাদক আইনের মামলায় আরমানের গ্রেফতার দেখানোর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা মহানগর হাকিম মো. সারাফুজ্জামান আনছারী দুই মামলায় আসামিদের গ্রেফতার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।এরপর একই এজলাসে বিচারক পরিবর্তন হয়ে ঢাকা মহানগর হাকিম মো. তোফাজ্জল হোসেন আসেন। এ আদালতে দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে আসামিদের রিমান্ড শুনানি হয়। শুরুতেই আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সম্রাটের হাতে হাতকড়া খুলে দেয়ার জন্য বিচারকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তারা বলেন, আসামি (সম্রাট) আদালতের কাছেই আছেন। তাহলে আর কীসের নিরাপত্তা? দয়া করে তার (সম্রাট) হাতকড়া খুলে দেয়ার আদেশ দেন।
প্রথমে অস্ত্র আইনের মামলায় রিমান্ড শুনানি হয়। আদালতের সংশ্লিষ্ট থানার সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন আসামি সম্রাটের রিমান্ড আবেদনের শুনানি করেন। তিনি বলেন, আসামির কাছে আরও অবৈধ অস্ত্র আছে। অবৈধ অস্ত্রগুলো উদ্ধার লক্ষ্যে আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ জরুরি।ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবু আসামির রিমান্ড শুনানি করেন। তিনি বলেন, ৬ অক্টোবর ভোরে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে তাকে (সম্রাট) গ্রেফতার করা হয়েছে। ক্যাসিনো অভিযান পরিচালনাকালে তিনি ঢাকা থেকে পালিয়ে যান। গ্রেফতারের পর তার দেখানো স্থান থেকে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রের কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। আসামির কাছে থাকা আরও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে রিমান্ডের একান্ত প্রয়োজন। রাষ্ট্রপক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী তাপস কুমার পাল, শিহাব উদ্দিন, আজাদ রহমান প্রমুখ।অপরদিকে আসামিপক্ষে বেলায়েত হোসেন, আক্তার হোসেন ভূঁইয়া, আফরোজা শাহনাজ পারভীন (হীরা) রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন শুনানি করেন।শুনানির শুরুতেই তারা আসামির হাতকড়া খোলার জন্য বিচারকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তারা বলেন, আসামির হাত থেকে হাতকড়া খোলার আদেশ দেন।আদালত তাদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা (আসামিপক্ষের আইনজীবী) আসামির হাতকড়া খোলার জন্য আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। আদালত বিষয়টি শুনেছে। এবার শুনানি শুরু করুন। এরপর শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, সম্রাট যুবলীগের আহ্বায়ক ছিলেন। এরপর সাংগঠনিক সম্পাদক ও পরে সভাপতি হন। তিনি সবসময়ই নেতাকর্মীদের আপদে-বিপদে পাশে থাকতেন। একটি কুচক্রীমহল তার বিরুদ্ধে এ মামলা করেছে। গ্রেফতারের পর দুপুরের দিকে তাকে মাল্টিস্টোর বিল্ডিংয়ে আনা হয়।সেটা তার বাসস্থান না, অফিস। অনেক লোক সেখানে যাওয়া-আসা করে। এমনকি তাকে ফাঁসানোরও সুযোগ আছে। প্রতিটি অভিযানে মিডিয়া ঢুকতে দেয়া হলেও তার বেলায় ঢুকতে দেয়া হয়নি।আসামি (সম্রাট) ওপেন হার্ট সার্জারির রোগী, ভাল্বে সমস্যাসহ নানা রোগে আক্রান্ত। প্রতিমাসে তাকে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। এমতাবস্থায় রিমান্ডে নিলে তার জীবন হুমকিতে পড়বে। আগে তাকে বাঁচতে দিতে হবে। মামলায় অস্ত্র উদ্ধার হয়ে গেছে, এখন আর রিমান্ডের যৌক্তিকতা নেই। প্রয়োজনে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে।আসামিপক্ষে আফরোজা শাহনাজ পারভীন (হীরা) নিজেকে সম্রাটের কমিটির আইন সম্পাদক পরিচয় দিয়ে শুনানিতে বলেন, ‘সম্রাট ভাই’ গ্রেফতার হওয়ার আগে, আমি ও আমার স্বামী তার কার্যালয়ে গিয়েছিলাম। অনেক নেতাকর্মী তাকে খাবার দিত। সেগুলো ফ্রিজে রাখা হতো। আমরা যাওয়ার পর ওই ফ্রিজ থেকে আমাদের খাবার বের করে দিয়েছেন।আর সেই ফ্রিজেই নাকি বিদেশি মদ পাওয়া গেছে। সম্রাট পালাতে চাইলে যে কোনো সময়, যে কোনো স্থানে পালাতে পারতেন। তিনি রাজনীতি ভালোবাসেন। তাই তিনি পালাননি। কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে এ আইনজীবী এজলাসেই কেঁদে ফেলেন।এরপর মাদক মামলায় দুই আসামির রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, সম্রাটকে নিয়ে কাকরাইল অফিসে অভিযানে তার দেখানো স্থান থেকে ১৯ বোতল বিদেশি মদ (১৯ লিটার, আনুমানিক মূল্য ৯৫ হাজার টাকা), ৪ প্যাকেট তাস ও ১ হাজার ১৬০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। আসামির হেফাজতে থাকা আরও মাদক উদ্ধারের লক্ষ্যে আসামির রিমান্ড প্রয়োজন।অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, মাদকগুলো ব্রিফকেসে পেয়েছে। ওই ব্রিফকেস রুমের কোথায় ছিল? খাটের নিটে না কি উপরে? উত্তর দিকে না কি দক্ষিণ দিকে?রিমান্ড আবেদনে সেসব বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। আর সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া রিমান্ডের কোনো যৌক্তিকতা নেই। সুতরাং রিমান্ড হতে পারে না। আসামি অসুস্থ। তার জামিন প্রার্থনা করছি। এছাড়া আসামি আরমানের পক্ষে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম সুমন রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন শুনানি করেন।উভয়পক্ষের শুনানি শেষে দুপুর ১টা ২১ মিনিটের দিকে আদালত আদেশের জন্য পাঁচ মিনিট সময় নেন। কিছুক্ষণ পর আদালত আসামিদের জামিন নাকচ করে রিমান্ডের ওই আদেশ দেন। এদিকে আদালতে দুই মামলার শুনানি শেষে সম্রাটকে আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেছে। এ সময় তাকে হাসতে দেখা যায়।এর আগে ৯ অক্টোবর এ দুই মামলায় রিমান্ড শুনানি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অসুস্থ থাকায় সম্রাটকে আদালতে হাজির করেননি কারা কর্তৃপক্ষ। তাই ওইদিন আসামির উপস্থিতিতে শুনানির জন্য পরে এদিন ধার্য করেন আদালত। ৭ অক্টোবর র‌্যাব-১ এর ডিএডি আবদুল খালেক বাদী হয়ে রমনা থানায় অস্ত্র ও মাদক আইনের এ দুটি মামলা করেন।অস্ত্র মামলায় শুধু সম্রাট এবং মাদক মামলায় সহযোগী আরমানসহ সম্রাটকে আসামি করা হয়েছে। ওইদিনই দুই মামলায় আসামিদের আদালতে হাজির করে গ্রেফতার দেখানো ও রিমান্ডের আবেদন করা হয়।
রিমান্ড আবেদনে যা আছে : অস্ত্র আইনের মামলায় রমনা থানার পুলিশ পরিদর্শক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম আসামি সম্রাটের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। গ্রেফতারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট জানান, কাকরাইল অফিসে মাদকদ্রব্য ও অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রসহ তার সহযোগীরা অবস্থান করছে। এরপরই কাকরাইল অফিসে অভিযান শুরু হয়।
সম্রাটের দেখানো মতে তার বেড রুমের জাজিমের ওপরে তোষকের নিচ থেকে ৫ রাউন্ড গুলিভর্তি ম্যাগাজিনসহ একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। রুম থেকে দুইটি ইলেকট্রিক শক মেশিন ও ২টি লাঠি উদ্ধার করা হয়। আগ্নেয়াস্ত্রের বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি সম্রাট। প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, তার বিরুদ্ধে কেউ ভিন্নমত পোষণ করলে কিংবা কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে ক্যাডার বাহিনী ইলেকট্রিক শক ও লাঠি দ্বারা শারীরিকভাবে নির্যাতন করত।এদিকে মাদক আইনের মামলায় গুলশান থানার পুলিশ পরিদর্শক মো. মাহফুজুল হক ভূঞা দুই আসামির ১০ দিন করে রিমান্ডের আবেদন করেন। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, সম্রাটকে নিয়ে তার কাকরাইল অফিসে অভিযানে তার দেখানো স্থান থেকে ১৯ বোতল বিদেশি মদ, ৪ প্যাকেট তাস ও ১ হাজার ১৬০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। আসামিরা উদ্ধারকৃত মাদকদ্রব্যের কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেনি।
আদালতের নিরাপত্তা জোরদার : এদিকে সম্রাটের রিমান্ড শুনানি উপলক্ষে আদালতপাড়ায় সকাল থেকেই পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বেলা ১১টার পর সিএমএম আদালতের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেয়া হয়। আদালত চত্বরে সব ধরনের ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোও তুলে দেয়া হয়।
আদালত চত্বরে নেতাকর্মীদের ভিড় : বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে সম্রাটকে কারাগার থেকে সিএমএম আদালতের হাজতখানায় আনা হয়। এর এক ঘণ্টা পর তাকে হাজতখানা থেকে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। তার আসার খবরে এদিন সকাল থেকে সিএমএম চত্বরে দলীয় নেতাকর্মীদের ভিড় বাড়তে থাকে।দলীয় নেতাকর্মীরা সিএমএম প্রধান ফটক থেকে শুরু করে আদালতের ভেতর পর্যন্ত উপস্থিত ছিলেন। আদালতে উপস্থাপনের আগে ও পরে তারা ‘সম্রাট ভাইয়ের মুক্তি চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এদিকে নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ‘ইসমাইল হোসেন সম্রাট মুক্তি পরিষদ’ আদালত চত্বর পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে ফেলে।

Comments

comments

সম্পাদক ও প্রকাশক : ডাঃ আওরঙ্গজেব কামাল
সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : ইজ্ঞি: মোঃ হোসেন ভূইয়া।
বার্তা সম্পাদক : জহিরুল ইসলাম লিটন
যুগ্ন-সম্পাদক : শামীম আহম্মেদ

ঢাকা অফিস : জীবন বীমা টাওয়ার,১০ দিলকুশা বানিজ্যিক (১০ তলা) এলাকা,ঢাকা-১০০০
মোবাইলঃ ০১৭১৬-১৮৪৪১১,০১৯৪৪২৩৮৭৩৮

E-mail:dnanewsbd@gmail.com

© 2011 Allrights reserved to Daily Detectivenews